ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্ব চরম হুমকিতে: ডিএসসিসি প্রশাসক

ঢাকা শহর চরম হুমকির মধ্যে আছে মন্তব্য করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম বলেছেন, শহরের পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। এদিকে আমরা শুধু কংক্রিটের শহর বানাচ্ছি। বিশাল বিশাল হাউজিং তৈরী করছি আর টাকার মালিক হচ্ছি। কিন্তু, ভবিষ্যত প্রজন্ম বাঁচবে কিনা- আমরা সেটি নিয়ে চিন্তা করছি না।
রবিবার (২৮ জুন) জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) উদ্যোগে আয়োজিত "নিমতলী ট্রাজেডি: অবহেলাজনিত হত্যাকান্ড থামবে কবে?" শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, সারা পৃথিবীতে পরিবেশের পরিবর্তন হচ্ছে। ঢাকা শহরে কিছুদিন পরপর ভূমিকম্প আমাদের নক করতেছে। যেকোনো সময় বড় আকারে হিট করতে পারে। এর জন্য সরকারের পদক্ষেপের পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতা দরকার।
তিনি বলেন, ভবন নির্মাণের অনুমতি নিয়ে যারা পরিকল্পনা পরিবর্তন করে ভিন্নভাবে ভবন নির্মাণ করছে, তাদেরকে আইনের আওতায় এনে জরিমানা করা দরকার।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সমালোচনা করে আব্দুস সালাম বলেন, সেখানে পরিবেশ নিয়ে কাজ করা অনেক লোক ছিলেন। তারা চাইলে অনেক স্ট্রংলি কাজ করতে পারতেন। কিন্তু, তাদেরকে পরিবেশ নিয়ে তেমন কাজ করতে দেখিনি।
ঘনবসতিপূর্ণ জায়গাগুলোতে ক্যামিকেলের ব্যবসা নিয়ে তিনি বলেন, অনেক জায়গায় ক্যামিকেলের ব্যবসা বাণিজ্য হচ্ছে। কিন্তু, এটাতো মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করার মতো অবস্থা। সরকারের ঠিক করে দেওয়া নির্দিষ্ট জায়গায় ক্যামিকেল ব্যবসায়ীরাও যেতে চাচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, ক্যামিকেল ব্যবসা করার জন্য যেসমস্ত বাড়িওয়ালারা বাসা ভাড়া দিচ্ছেন, তাদেরকে প্রশাসনের মাধ্যমে বুঝাতে হবে যে, এখানে এসব ব্যবসার জন্য বাসা ভাড়া দেওয়া যাবে না। এসব বিষয়ে সিটি করপোরেশন থেকে শুরু করে প্রশাসন— সবাইকে কঠিন হওয়া উচিত।
ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, দেশে আইন থাকলেও, সেটির প্রয়োগ নেই। আবার সবাই আইনের কথা বললেও, সেটি আবার ভঙ্গ করছে।
ডেঙ্গু নিয়ে তিনি বলেন, আমরা ঢাকা শহরে একটা জরিপ করেছি। সেখানে দেখা গেছে, ৬০ শতাংশ বাড়িতে মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। সেজন্য সর্বপ্রথম আমাদের জনসচেতনতা সৃষ্টি করা প্রয়োজন।
জলাবদ্ধতা নিয়ে তিনি বলেন, নগরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলেও সহজে সিটি করপোরেশনকে দোষ দেয়া যায়। কিন্তু জলাবদ্ধতার জন্য যারা (নগরবাসী) দায়ী, এটা আর কেউ বলছে না।
পুরান ঢাকা নিয়ে নতুন পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে আব্দুস সালাম বলেন, পুরান ঢাকায় আবারও পঞ্চায়েত পদ্ধতি চালু করতে হবে। সেখানে ওয়ান ওয়ে ট্রাফিক সিস্টেম করার চিন্তা করছি। রিকশা এবং হকারদেরকে আমরা একটা সিস্টেমের মধ্যে আনতে চাই।
সেমিনারে বাপা'র যুগ্ম সম্পাদক অধ্যাপক ড. আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার নিমতলী ট্রাজেডি নিয়ে একটি প্রবন্ধ পাঠ করেছেন। সেখানে তিনি নিমতলীর মতো দূর্ঘটনা প্রতিরোধে বাস্তবায়নযোগ্য নীতিগত ১১ টি সুপারিশ উত্থাপন করেছেন। সেগুলো হলো:
১. আবাসিক এলাকা থেকে রাসায়নিক গুদাম ও ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পকারখানার সম্পূর্ণ স্থানান্তর।
২. জাতীয় রাসায়নিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা কাঠামো প্রণয়ন।
৩. ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের আধুনিকায়ন।
৪. আইন ও বিল্ডিং কোডের কঠোর বাস্তবায়ন।
৫. ডিজিটাল লাইসেন্সিং ও নিয়মিত নিরাপত্তা পরিদর্শন।
৬. ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের জাতীয় ডেটাবেস ও প্রকাশ্য তালিকা।
৭. ভবনের বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা সনদ (Fitness Certificate)
৮. জরুরি প্রস্তুতি ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি।
৯. আইনের বাস্তবায়ন (সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা)।
১০. অগ্নিদুর্যোগমুক্ত ও নিরাপদ নগরায়ণে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার নিশ্চিতকরণ।
১১. জাতীয় নগর অগ্নি ও রাসায়নিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কর্মপরিকল্পনা (National Urban Fire and Chemical Risk Management Action Plan) প্রণয়ন।
এসময় কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, নিমতলী কেমিক্যাল ট্র্যাজেডি আমাদের শিখিয়েছে যে দুর্যোগ শুধু দুর্ঘটনা নয়, বরং অবহেলা, দুর্বল আইন প্রয়োগ ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফল। নিরাপদ ও দুর্যোগ-সহনশীল বাংলাদেশ গড়তে কঠোর আইন বাস্তবায়ন, কার্যকর তদারকি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করাই ভবিষ্যতে এ ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা প্রতিরোধের মূল শর্ত।
সেমিনারের সভাপতিত্ব করেছেন বাপা'র সভাপতি অধ্যাপক ড. নুর মোহাম্মদ তালুকদার। এসময় স্থপতি ইকবাল হাবিব, বাপা'র সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি'র সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্সসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
ভিওডি বাংলা/খতিব/এমএস








মন্তব্য