অবৈধ শ্রমিক সরবরাহ
মালয়েশিয়ায় ৬ বাংলাদেশি গ্রেপ্তার, ৩১ পাসপোর্ট জব্দ

অবৈধ বিদেশি শ্রমিক সরবরাহের অভিযোগে মালয়েশিয়ায় স্থায়ী বাসিন্দার (মাইপিআর) মর্যাদাপ্রাপ্ত একজনসহ ৬ বাংলাদেশি ও এক থাইল্যান্ডের নারী গ্রেপ্তার হয়েছেন।
কুয়ালালামপুরের স্থানীয় সময় শুক্রবার (১৭ জুলাই) তাদের গ্রেপ্তার করা হয় বলে সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে।
অবৈধ শ্রমিক সরবরাহকারী একটি সংঘবদ্ধ চক্র পরিচালনার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করে দেশটির অভিবাসন বিভাগ।
এক মাসব্যাপী গোয়েন্দা নজরদারির পর পরিচালিত বিশেষ অভিযানে তার সঙ্গে আরও পাঁচ বাংলাদেশি ও এক থাইল্যান্ডের নারীকে আটক করা হয়েছে।
অভিযানকালে ৩১টি বাংলাদেশি পাসপোর্ট, একটি থাই পাসপোর্ট, কোম্পানির বিভিন্ন নিবন্ধনসংক্রান্ত নথি এবং ৪৮ হাজার ৫২৪ মালয়েশিয়ান মুদ্রা ‘রিঙ্গিত’ জব্দ করা হয়েছে।
শুক্রবার মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগের মহাপরিচালক দাতুক জাকারিয়া শাবান এক বিবৃতিতে এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, গত ১৫ জুলাই সেলাঙ্গর অঙ্গরাজ্যের সেমেনিয়াহ এলাকায় দুটি পৃথক স্থানে বিশেষ অভিযান চালানো হয়। এই অভিযান পরিচালনার আগে প্রায় এক মাস ধরে সংশ্লিষ্ট চক্রটির ওপর গোয়েন্দা নজরদারি চালানো হয়েছিল। অভিযানে মূল সন্দেহভাজনসহ মোট সাতজন বিদেশি নাগরিককে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে ছয়জন বাংলাদেশি এবং একজন থাই নারী রয়েছেন। আটক ব্যক্তিদের বয়স ২৭ থেকে ৫৭ বছরের মধ্যে।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, চক্রটির মূল হোতা একজন বাংলাদেশি নাগরিক হলেও তিনি মালয়েশিয়ার স্থায়ী বাসিন্দার মর্যাদা অর্জন করেছিলেন। আটক অন্য বাংলাদেশিদের মধ্যে একজন বৈধ ছাত্র ভিসা নিয়ে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছিলেন।
অপরদিকে গ্রেপ্তার হওয়া থাই নারীর কাছে একটি রেস্তোরাঁয় কর্মরত থাকার জন্য বৈধ অস্থায়ী কর্মসংস্থান ভিজিট পাস ছিল। তবে বাকি বাংলাদেশিদের কারও কাছে মালয়েশিয়ায় বৈধভাবে অবস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় পাস বা ভ্রমণ সংক্রান্ত বৈধ নথি পাওয়া যায়নি।
অভিযানের সময় কর্মকর্তারা ৩১টি বাংলাদেশি পাসপোর্ট এবং একটি থাই পাসপোর্ট উদ্ধার করেন। এছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধনসংক্রান্ত কাগজপত্র, ব্যবসায়িক নথি এবং ৪৮ হাজার ৫২৪ রিঙ্গিত নগদ অর্থ জব্দ করা হয়। তদন্তকারীদের ধারণা, এসব নথি ও অর্থ চক্রটির অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত।
তদন্তে আরও জানা যায়, মূল অভিযুক্ত প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন ছাড়াই বিদেশি শ্রমিক সংগ্রহ, ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সরবরাহের কাজ করতেন। বিশেষ করে ক্লাং ভ্যালি অঞ্চলের স্থানীয় নিয়োগদাতাদের লক্ষ্য করে এই কার্যক্রম পরিচালিত হতো। যেসব প্রতিষ্ঠান বিদেশি শ্রমিকের প্রয়োজন হতো, তাদের কাছে শ্রমিক সরবরাহের ব্যবস্থা করে দিত এই চক্র।
অভিবাসন বিভাগের দাবি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে চক্রটি বৈধ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং খাবারের দোকানের আড়ালে তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করত। বাইরে থেকে এগুলো সাধারণ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হলেও ভেতরে বিদেশি শ্রমিক সংগ্রহ, তাদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ এবং অভিবাসন-সংক্রান্ত কাগজপত্রের ব্যবস্থা করার কাজ চলত।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, বিদেশি শ্রমিকদের অভিবাসন-সংক্রান্ত পাস ইস্যু ও নবায়নের নামে প্রত্যেক শ্রমিকের কাছ থেকে ৪ হাজার মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত করে আদায় করা হতো। বৈধ অনুমোদন ছাড়াই এই অর্থ আদায়ের মাধ্যমে চক্রটি বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করছিল বলে ধারণা করছে তদন্তকারীরা।
মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগের মহাপরিচালক জানান, মূল বাংলাদেশি সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে পাসপোর্ট আইন ১৯৬৬-এর ১২(১)(এফ) ধারা এবং অভিবাসন আইন ১৯৫৯/৬৩-এর ৫৫বি ধারা অনুযায়ী তদন্ত চলছে।
এছাড়া আটক বাংলাদেশি ছাত্র এবং থাই নারীর বিরুদ্ধে অভিবাসন বিধিমালা ১৯৬৩-এর ৩৯(বি) বিধি অনুযায়ী তদন্ত করা হচ্ছে। অন্যদিকে বৈধ কাগজপত্র ছাড়া অবস্থানরত বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে অভিবাসন আইন ১৯৫৯/৬৩-এর ৬(১)(সি) ধারা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
গ্রেপ্তার হওয়া সাতজনকেই পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার জন্য পুত্রজায়া অভিবাসন কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তদন্তের স্বার্থে চারজন মালয়েশিয়ান নাগরিক এবং আরও একজন বাংলাদেশি নাগরিককে নোটিশ দিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হয়েছে।
দাতুক জাকারিয়া শাবান বলেন, মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগ অবৈধ বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ, মানবসম্পদ সরবরাহে অনিয়ম এবং অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও চক্রগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করবে। দেশের জনশৃঙ্খলা, নিরাপত্তা এবং অভিবাসন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
মালয়েশিয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে অবৈধ অভিবাসন, বিদেশি শ্রমিক নিয়োগে অনিয়ম এবং ভিসা জালিয়াতির বিরুদ্ধে দেশটির অভিবাসন বিভাগ ধারাবাহিকভাবে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, এসব অভিযানের লক্ষ্য হলো বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ ব্যবস্থাকে নিয়মতান্ত্রিক করা, মানবপাচার ও অবৈধ শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণে আনা এবং অভিবাসন আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
ভিওডি বাংলা/এফএ








মন্তব্য