পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া ভারতের শিক্ষার্থী আন্দোলন এখন শুধু শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট নয়, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের জন্যও একটি বড় রাজনৈতিক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) দাবি করছে, এটি কেবল প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে নয়; বরং জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থার দাবিতে তরুণদের আন্দোলন।
গত কয়েক সপ্তাহে আন্দোলন দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে। সোমবার হাজার হাজার শিক্ষার্থী ভারতের পার্লামেন্ট অভিমুখে মিছিল করার চেষ্টা করলে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও লাঠিচার্জ করে। এরপরও দিল্লিসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে।
সিজেপির মূল দাবি হলো শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। আন্দোলনের অন্যতম মুখ সামাজিক কর্মী সোনম ওয়াংচুক এ দাবিতে ২৬ দিন অনশন করেন। অনশনের সময় তার ওজন প্রায় ১১ কেজি কমে যায়। তিনি অনশন ভাঙলেও আন্দোলনের নেতারা জানিয়েছেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চলবে।
শুধু শিক্ষার্থী আন্দোলন নয়
ভারতে অতীতেও শিক্ষার্থী আন্দোলন বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা করেছে। সত্তরের দশকে গুজরাটের 'নব নির্মাণ' আন্দোলন এবং জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে সরকারবিরোধী আন্দোলনের কথা এখনও আলোচিত।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য ভিন্ন। নাগরিকত্ব আইন, কৃষক আন্দোলন বা অন্যান্য রাজনৈতিক ইস্যুর মতো এটি কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শ বা সম্প্রদায়ভিত্তিক আন্দোলন নয়। বরং লাখো তরুণের ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী পরীক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র ভিজিটিং ফেলো ইয়ামিনি আইয়ার বিবিসিকে বলেন, "পরীক্ষা ও শিক্ষা ব্যবস্থা জাতপাত, শ্রেণি ও লিঙ্গ—সবকিছুকে ছাপিয়ে যায়। তাই এই আন্দোলনের ভিত্তি অনেক বিস্তৃত।"
শাসনব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন
দিল্লিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের ফেলো রাহুল ভার্মার মতে, এই আন্দোলন বিজেপির জন্য আলাদা ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
তার ভাষায়, "এটি কোনো আদর্শগত বিতর্ক নয়। এটি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে—সরকার কি সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা নিতে এবং প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে সক্ষম?"
তিনি বলেন, আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেক তরুণই বিজেপির স্বাভাবিক বিরোধী নন। তারা এবং তাদের পরিবার সরকারি চাকরি ও উচ্চশিক্ষার সুযোগকে সামাজিক উন্নতির প্রধান পথ হিসেবে দেখেন। ফলে এই অসন্তোষ মোকাবিলায় সরকার আগের মতো রাজনৈতিক বিভাজনের কৌশল সহজে ব্যবহার করতে পারছে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে রাজপথে
শুরুর দিকে অনেকে মনে করেছিলেন, আন্দোলন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু সোমবারের বিশাল সমাবেশ সেই ধারণা বদলে দিয়েছে।
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জয়জিৎ পাল বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ দ্রুত বিস্ফোরিত হতে পারে।
তার মতে, রাষ্ট্রের জবাবদিহির অভাব নিয়ে জমে থাকা ক্ষোভই এই আন্দোলনকে ব্যাপক আকার দিয়েছে।
রাজনৈতিক দলের বাইরে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ
বিশ্লেষকদের মতে, আন্দোলনে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন, বামপন্থী সংগঠন ও দলিত অধিকার সংগঠন অংশ নিলেও সবচেয়ে বড় বিষয় হলো—দেশজুড়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ।
ইয়ামিনি আইয়ার বলেন, আন্দোলন এখন আর কেবল সিজেপি বা সোনম ওয়াংচুককে ঘিরে নেই। এটি তাদের সীমা অতিক্রম করেছে।
তার মতে, প্রশ্নফাঁসের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের স্লোগান, পোস্টার ও ব্যানারে বেকারত্ব, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশার মতো বিস্তৃত বিষয়ও উঠে এসেছে।
সরকারের প্রতিক্রিয়া
প্রথম দিকে আন্দোলনের জবাব দেন সরকারের মন্ত্রী ও বিজেপির মুখপাত্ররা। পরে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং অভিযোগ করেন, বিরোধী দলগুলো শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
বৃহস্পতিবার প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে এ বিষয়ে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, "আমাদের তরুণদের ভবিষ্যৎ ও কল্যাণের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছু নেই।"
তিনি প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত বিচারের জন্য বিশেষ আদালত গঠনের ঘোষণা দিয়ে বলেন, "যারা দেশের তরুণদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করার চেষ্টা করবে, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।"
ক্ষোভ কি দীর্ঘস্থায়ী হবে?
বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলন ভারতের ধীরগতির অর্থনীতি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগের প্রতিফলন।
জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ সুরজিৎ মজুমদার বলেন, প্রশ্নফাঁসের ঘটনাই একমাত্র কারণ নয়; দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ও সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে তরুণদের দীর্ঘদিনের অসন্তোষই এই আন্দোলনের ভিত্তি।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক সুহাস পালশিকারের মতে, আন্দোলনটি হয়তো কৃষক আন্দোলনের মতোই মানুষের ক্ষোভ প্রকাশের একটি বড় মাধ্যম হয়ে থাকবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নাও নিতে পারে।
তার মতে, আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে সরকারের দমননীতি, গণমাধ্যমের ভূমিকা, নেতৃত্বের সক্ষমতা এবং বৃহত্তর সামাজিক জোট গড়ে তোলার ওপর।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—ভারতের তরুণরা দেখিয়ে দিয়েছেন, ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের উদ্বেগ এখন রাজপথে নেমে এসেছে। এই আন্দোলন সাময়িক ক্ষোভ হয়ে থাকবে, নাকি ভারতের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে—সেই উত্তর সময়ই দেবে।
সূত্র: বিবিসি
ভিওডি বাংলা/আরআর/আ









মন্তব্য