আল জাজিরা’র বিশ্লেষণ
মার্চ থেকে জুলাই: কী বদলেছে?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়ার পর আবারও দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হয়েছে। পারস্য উপসাগরজুড়ে বিমান হামলার সতর্কসংকেত, হরমুজ প্রণালী বন্ধ, তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য আবারও বড় ধরনের সংঘাতের মুখোমুখি।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে না গেলেও মার্চ মাসের সংঘাতের তুলনায় এবার যুদ্ধের ধরন, লক্ষ্যবস্তু, কূটনৈতিক পরিবেশ এবং আঞ্চলিক বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে।
কীভাবে ভেঙে পড়ল যুদ্ধবিরতি?
গত ৬ জুলাই ওমান উপকূলের কাছে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। এর মধ্যে একটি ছিল কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বহনকারী জাহাজ।
এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালায়। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।
এরপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি "শেষ হয়ে গেছে"। একই সময়ে ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয় এবং অভিযোগ করে, বিকল্প নৌপথ চালুর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ওই জলপথের ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপ করছে।
এর পর থেকেই উভয় পক্ষের মধ্যে ধারাবাহিক সামরিক অভিযান শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালীর আশপাশের একাধিক ইরানি শহরে হামলা চালায়। অন্যদিকে ইরান বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, জর্ডান ও কাতারের বিভিন্ন স্থাপনা এবং হরমুজ প্রণালীতে চলাচলকারী জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালায়।
আবার কি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হয়েছে?
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংঘাত এখনো পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ নয়। বরং এটি সীমিত পরিসরে ধারাবাহিক সামরিক লড়াইয়ে রূপ নিচ্ছে।
ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে মার্চে শুরু হওয়া যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিভিন্ন শহরে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। সেই অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হন বলে দাবি করা হয়।
অন্যদিকে এবার যুক্তরাষ্ট্রের হামলার মূল কেন্দ্র হরমুজ প্রণালীর আশপাশের অঞ্চল। ইরানও মূলত উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করছে। যদিও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার সময় ধ্বংসাবশেষ বিভিন্ন এলাকায় পড়ে হতাহতের ঘটনাও ঘটছে।
তবে উভয় দেশই এখনো আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেনি। যুদ্ধবিরতি শেষ ঘোষণা করার পরও ট্রাম্প বলেছেন, আলোচনা অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে কাতার ও পাকিস্তাল পর্দার আড়ালে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ
নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপরও অভ্যন্তরীণ চাপ বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ার পাওয়ার্স অ্যাক্ট অনুযায়ী, ৬০ দিনের বেশি যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হলে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন। ট্রাম্প প্রশাসন আগে দাবি করেছিল যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে, ফলে সেই সময়সীমা কার্যকর হয়নি।
এদিকে জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমেছে। অনেক মার্কিন ভোটার মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে অসন্তুষ্ট।
মার্চের তুলনায় যে পরিবর্তন
লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন: মার্চের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সামরিক ঘাঁটির পাশাপাশি জ্বালানি অবকাঠামোতেও হামলা চালায়। ইরান পাল্টা উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাস স্থাপনা লক্ষ্য করে আঘাত হানে। বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
এছাড়া যুদ্ধের প্রথম দিনেই দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরের একটি স্কুলে হামলায় বহু বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।
বর্তমান সংঘাতে তুলনামূলকভাবে উভয় পক্ষই বেসামরিক অবকাঠামো ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে। এখন তাদের মূল লক্ষ্য সামরিক স্থাপনা এবং হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।
ভূমিকা বদলেছে: মার্চের সংঘাতে ইসরায়েল ছিল সরাসরি অংশীদার। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও পর্যন্ত বলেছিলেন, ইসরায়েলের চাপেই ওয়াশিংটন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।
কিন্তু বর্তমান সংঘাতে ইসরায়েল প্রকাশ্যে সামরিক অভিযানে অংশ নেয়নি।
যদিও লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের বিচ্ছিন্ন হামলা অব্যাহত রয়েছে।
ইসলামাবাদ সমঝোতা এখনো আলোচনার ভিত্তি: জুন মাসে পাকিস্তালের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়, সেটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল হয়নি।
তবে উভয় পক্ষই একে অপরকে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ করছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দুই দেশের মধ্যে নতুন উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ চললেও কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
কাতারের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ বলেন, উভয় পক্ষ এখন একে অপরের ‘রেড লাইন’ কোথায়, সেটি বোঝার চেষ্টা করছে।
তার মতে, সংঘাতের শুরু থেকে ইরানের লক্ষ্য আরও বিস্তৃত হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এখন আর সরকার পরিবর্তনের কথা বলছে না। বরং তেহরানের কিছু মহল এখন পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব প্রতিষ্ঠার কথা বলছে।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
বিশ্লেষকদের ধারণা, বর্তমান পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যকে আবারও দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। যদিও কূটনৈতিক পথ এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, তবে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে চলমান সামরিক উত্তেজনা এবং দুই দেশের পারস্পরিক অবিশ্বাস দ্রুত সমাধানের সম্ভাবনাকে কঠিন করে তুলছে।
ফলে যুদ্ধবিরতির ভাঙন মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়েছে এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজার ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে।
ভিওডি বাংলা/আরআর/এমএস








মন্তব্য