সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে-স্কেল এখনো ঝুলে আছে

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল আলোচিত নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়ছে। চলতি জুলাই মাসে নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। যদিও বাজেট ঘোষণায় ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে এ কাঠামো বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছিল সরকার।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সহ একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং সফটওয়্যারজনিত জটিলতা কাটিয়ে আগামী সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি কিংবা শেষ সপ্তাহে গেজেট জারি হতে পারে। নতুন বেতন কাঠামোর খসড়া ইতোমধ্যে প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, প্রশাসনিক বাস্তবতা এবং ডিজিটাল বেতন ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গেজেট প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে। এ কারণে নির্ধারিত সময়ের তুলনায় কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। তবে গেজেট প্রকাশে দেরি হলেও নতুন পে-স্কেলের কার্যকারিতা ১ জুলাই থেকেই গণনা করা হতে পারে। সেক্ষেত্রে চাকরিজীবীরা বর্ধিত বেতন ও বকেয়া সুবিধা একসঙ্গে পাবেন।
গেজেট প্রকাশে দেরি হওয়ায় সরকারি চাকরিজীবী ও অবসরপ্রাপ্তদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। নতুন বেতনের হার, ধাপে ধাপে বেতন বৃদ্ধির প্রক্রিয়া, বিভিন্ন ভাতা যুক্ত হওয়ার সময় এবং অবসরপ্রাপ্তদের সুবিধা নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছিলেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, গেজেট বিলম্বের অন্যতম কারণ সফটওয়্যার জটিলতা। ২০১৫ সালের অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেল বাস্তবায়নের সময় অধিকাংশ কার্যক্রম ম্যানুয়ালি সম্পন্ন হলেও বর্তমানে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি ডিজিটাল পদ্ধতিনির্ভর।
এখন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ইনক্রিমেন্ট, পেনশন, গ্র্যাচুইটি এবং জিপিএফসহ বিভিন্ন আর্থিক কার্যক্রম ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) ও আইবাস সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে ধাপে ধাপে মূল বেতন কার্যকর করতে গেলে সফটওয়্যারে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে।
বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক আব্দুল মালেক বলেন, ‘আগের মতো হাতে বেতন নির্ধারণের সুযোগ এখন আর নেই। যদি একাধিক ধাপে মূল বেতন কার্যকর করা হয়, তাহলে একই কর্মচারীর জন্য বারবার পে-ফিক্সেশন করতে হবে।
এতে সফটওয়্যার পরিবর্তন, প্রশাসনিক জটিলতা এবং ভুল হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে।’
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, পদোন্নতি, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, টাইম স্কেল, সিলেকশন গ্রেড ও অবসরজনিত সুবিধা নির্ধারণেও জটিলতা দেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে অবসরের কাছাকাছি থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে উদ্বেগ বেশি দেখা দিয়েছে। কারণ পেনশন, গ্র্যাচুইটি ও ছুটির নগদায়নসহ অধিকাংশ আর্থিক সুবিধা শেষ প্রাপ্ত মূল বেতনের ওপর নির্ভরশীল। ডিজিটাল ব্যবস্থায় ধাপে ধাপে অবসর সুবিধা সমন্বয়ের সুযোগ না থাকায় তারা ভবিষ্যৎ প্রাপ্যতা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
এ পরিস্থিতিতে আব্দুল মালেক প্রথম ধাপেই শতভাগ মূল বেতন কার্যকর করার প্রস্তাব দিয়েছেন। তার মতে, এরপর বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতা পর্যায়ক্রমে যুক্ত করা যেতে পারে। এতে সফটওয়্যার সংশোধনের চাপ কমবে এবং অবসরপ্রাপ্তদের মধ্যে বৈষম্যের আশঙ্কাও থাকবে না।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, উচ্চপর্যায়ের সচিব কমিটি বর্তমানে নতুন বেতন কাঠামোর আর্থিক প্রভাব, সফটওয়্যারের সামঞ্জস্য এবং প্রশাসনিক দিকগুলো পর্যালোচনা করছে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এদিকে অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর উদ্যোগ সময়োপযোগী হলেও এর ফলে বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে। তাই বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছেন তারা।
ভিওডি বাংলা/এমএস








মন্তব্য