১৬ বছরেও নির্মাণ হয়নি দ্বিতীয় শোধনাগার, জ্বালানি নিরাপত্তায় বাড়ছে ঝুঁকি

বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) ওপর নির্ভরশীলতা দীর্ঘদিনের। কিন্তু দ্বিতীয় একটি শোধনাগার নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়ার ১৬ বছর পরও প্রকল্পটির কাজ শুরু না হওয়ায় দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম নেত্র নিউজের সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের এপ্রিলে ইআরএল প্রায় ২৬ দিন অপরিশোধিত তেলের সংকটে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়। ওই সময় ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার অস্থির হয়ে ওঠে এবং বাংলাদেশেও জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সংকটের মূল কারণ শুধু আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নয়; দীর্ঘদিন ধরে দ্বিতীয় শোধনাগার নির্মাণে বিলম্বও এর জন্য দায়ী।
চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় বিদ্যমান ইস্টার্ন রিফাইনারির পাশেই বছরে ৩০ লাখ মেট্রিক টন সক্ষমতার নতুন শোধনাগার নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। প্রকল্পটি সময়মতো বাস্তবায়িত হলে আমদানি করা পরিশোধিত জ্বালানির ওপর দেশের নির্ভরতা অনেকটাই কমানো সম্ভব হতো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ইস্টার্ন রিফাইনারিই দেশের একমাত্র অপরিশোধিত তেল শোধনাগার। এর বার্ষিক সক্ষমতা প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিক টন। অথচ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) হিসাবে দেশে বছরে প্রায় ৬৮ লাখ মেট্রিক টন বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। ফলে মোট চাহিদার প্রায় পাঁচ ভাগের মাত্র এক ভাগ দেশীয়ভাবে পরিশোধিত হয়, বাকিটা সরাসরি পরিশোধিত জ্বালানি হিসেবে আমদানি করতে হয়।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক মোহাম্মদ তামিমের মতে, বর্তমান রিফাইনারির প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে সব ধরনের অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হয় না। তিনি বলেন, দ্বিতীয় শোধনাগার নির্মিত হলেও আমদানি পুরোপুরি বন্ধ হবে না, তবে দেশের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের ধাক্কা সামাল দেওয়া সহজ হবে।
সরকারি নথি অনুযায়ী, দ্বিতীয় শোধনাগারের পরিকল্পনা শুরু হয় ২০১০ সালের দিকে। পরে ফরাসি প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান টেকনিপকে (Technip) প্রকল্পের প্রাথমিক প্রকৌশল নকশা বা ফ্রন্ট-এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইনের (FEED) কাজ দেওয়া হয়। নকশা সম্পন্ন হওয়ার পর ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্ডিয়া লিমিটেড (ইআইএল) প্রকল্পের ব্যয় পুনর্মূল্যায়ন ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা তৈরি করে।
২০১৮ সালে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয় প্রায় ১৮ হাজার ৮২৪ কোটি টাকা। সে সময় পাঁচ বছরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ব্যয়, চুক্তি এবং বাস্তবায়ন নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার পরও টেকনিপের সঙ্গে সমঝোতা হয়নি। শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ায় এবং পুরো উদ্যোগ কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।
পরে বেসরকারি শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ প্রকল্পে অর্থায়নের প্রস্তাব দিলেও মালিকানা কাঠামো নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে সেটিও বাস্তবায়নের পর্যায়ে যায়নি।
বর্তমান সরকার প্রকল্পটিকে নতুনভাবে 'ইস্টার্ন রিফাইনারি আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ' নামে পুনর্গঠন করেছে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ইতোমধ্যে সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। নতুন হিসাব অনুযায়ী প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় বেড়ে প্রায় ২ দশমিক ৫২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। নির্মাণ ব্যয়, প্রযুক্তি ও বিশেষায়িত যন্ত্রপাতির মূল্য বৃদ্ধিকে এ ব্যয় বৃদ্ধির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকার আশা করছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধে মূল নির্মাণকাজ শুরু করা যাবে এবং প্রায় তিন বছরের মধ্যে তা শেষ হবে।
তবে প্রকল্পটি এখনও অর্থনৈতিকভাবে কতটা লাভজনক হবে, সে প্রশ্নও তুলছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, নতুন বিনিয়োগের আগে ভবিষ্যৎ জ্বালানি চাহিদা, বৈশ্বিক নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে নতুন করে ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ করা জরুরি।
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ এম মাশরুর রিয়াজের মতে, বাংলাদেশ আগামী কয়েক দশকেও পেট্রোলিয়ামভিত্তিক জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল থাকবে। তাই দেরিতে হলেও দ্বিতীয় শোধনাগার নির্মাণ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করবে, পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির ব্যয় কমাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য বা সরবরাহে অস্থিরতার প্রভাব মোকাবিলায় সহায়ক হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, দ্বিতীয় শোধনাগার প্রকল্পটি শুধু একটি অবকাঠামো উন্নয়ন উদ্যোগ নয়; এটি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তবে অতীতের দীর্ঘসূত্রতা কাটিয়ে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ভিওডি বাংলা/আরআর/এমএস








মন্তব্য