রিমান্ডে নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু এখনও বড় চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশে নির্যাতন প্রতিরোধ, জবাবদিহিতা বৃদ্ধি এবং মানবাধিকার কাঠামো শক্তিশালী করার লক্ষ্যে রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে নির্যাতনবিরোধী সনদ ও এর ঐচ্ছিক প্রোটোকল বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভা। শনিবার নগরীর হোটেল গ্র্যান্ড রিভারভিউয়ে আয়োজিত সভায় মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর উদ্যোগে এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নেটওয়ার্ক ওএমসিটির সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত সভায় বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ ১৯৯৮ সালে নির্যাতনবিরোধী সনদ অনুমোদন করলেও এখনও এর ঐচ্ছিক প্রোটোকল অনুস্বাক্ষর না করায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
বক্তারা উল্লেখ করেন, রিমান্ডে নির্যাতন, হেফাজতে মৃত্যু, জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায় এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি মামলা করতে ভয় পান বা নানা বাধার মুখে পড়েন। দীর্ঘ তদন্ত প্রক্রিয়া, সাক্ষীর নিরাপত্তাহীনতা এবং রাষ্ট্রীয় সংস্থার বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনার জটিলতা ভুক্তভোগীদের নিরুৎসাহিত করে।
বক্তারা বলেন, ঐচ্ছিক প্রোটোকল অনুস্বাক্ষরের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে স্বাধীন প্রতিরোধ ব্যবস্থা গঠন, আটকস্থলে নিয়মিত ও নিরপেক্ষ পরিদর্শন নিশ্চিত এবং নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের আইনি সহায়তা ও সুরক্ষা জোরদার করা সম্ভব।
২০১৩ সালের ‘নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন’ শক্তিশালী হলেও মামলার সংখ্যা কম এবং বিচার আরও সীমিত। সাম্প্রতিক সময়ে নির্যাতনের কিছুটা হ্রাস লক্ষ্য করা গেলেও তা টেকসই করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা অপরিহার্য।
অধিকার পরিচালক সাজ্জাদ হোসেন বলেন, দেশে রিমান্ডে নির্যাতন, গুম, হেফাজতে মৃত্যু ও বিচারবহির্ভূত ঘটনার নথিভুক্তি এখনও চলছে, যা আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। নির্যাতন প্রতিরোধে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, শক্তিশালী আইনি কাঠামোর বাস্তবায়ন এবং মানবাধিকারকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
সভায় বক্তব্য দেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ড. ইফতেখারুল আলম মাসউদ, আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসমা সিদ্দিকা, সিনিয়র সাংবাদিক ডা. নাজিব ওয়াদুদ, নদী ও পরিবেশ গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী, রাজশাহী মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার গাজিউর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাবিনা ইয়াসমিন, রামেক হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. কফিল উদ্দিন, আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবুল কাসেম, রাজশাহী মহানগর আদালতের পিপি আলহাজ আলী আশরাফ মাসুম, জেলা আদালতের পিপি রইসুল ইসলাম, আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক পারভেজ, গুম থেকে ফিরে আসা রাজশাহী জেলা জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মর্তূজা, নির্যাতনের পর হত্যার শিকার নুরুল ইসলাম শাহিনের ছোট ভাই ড. ফজলুল হক তুহিন, নির্যাতনের পর হত্যার শিকার শহিদুল ইসলামের বড় ভাই ও রাজশাহী মহানগর জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক জসিম উদ্দিন সরকার, গুম থেকে ফিরে আসা আতিকুর রহমান, নির্যাতনের শিকার রফিকুল ইসলাম বকুল, গুম থেকে ফিরে আসা মাসুদ রানা সহ আরও অনেকে।
সভায় গুম ও নির্যাতনের শিকাররা তাদের অভিজ্ঞতার ভয়াবহতা তুলে ধরেন, যা উপস্থিত সবাইকে নাড়িয়ে দেয়।
অনুষ্ঠান শেষে বক্তারা নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তারা বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একই ধরনের সমস্যা উঠে আসা প্রমাণ করে—এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ইস্যু নয়; বরং জাতীয়ভাবে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এর স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন।
ভিওডি বাংলা/রমজান আলী/আ







