দায়িত্ববোধ থেকে ন্যায়বিচার নিশ্চিতের আহ্বান আইনমন্ত্রীর

দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে বিচারকদের সঠিক সিদ্ধান্তের পথ বেছে নিয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়কমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
তিনি বলেন, ‘আপনারা জনপ্রিয় সিদ্ধান্তের পরিবর্তে সবসময় আইন অনুযায়ী সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করবেন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবেন। আমরা আপনাদের পাশে থাকার চেষ্টা করবো।’
শনিবার (৯ মে) রাজধানীর বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট আয়োজিত সদ্য পদোন্নতিপ্রাপ্ত অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ও সমপর্যায়ের ৩৯ জন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তার পাঁচ দিনব্যাপী ওরিয়েন্টেশন কোর্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
সাংবিধানিকভাবে সুপ্রিম কোর্ট সর্বোচ্চ স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হলেও বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তা মেরুদণ্ডহীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘একজন বিচারকের স্বাধীনতা নিহিত থাকে তার মননে, তার কলমে, তার চিন্তা-চেতনায়। সে স্বাধীন আছে কি না, সেটাই হচ্ছে মুখ্য বিষয়।’
‘একজন বিচারক যেদিন চাকরিতে যোগদান করেন, সেদিনই ধরে নিতে হয় যে, তাকে চাকরির জন্য বাড়ির বাইরে অবস্থান করতে হবে। তারপর যখন তিনি পোস্টিংয়ের জন্য তদবির-দৌড়ঝাপ শুরু করেন, ঢাকায় থাকার জন্য পলিটিক্যাল এক্সিকিউটিভদের পেছনে দৌড়ঝাপ শুরু করেন, তাদের দিকে তাকিয়ে থাকেন, তখন কিন্তু প্রজাতন্ত্রের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে তিনি নিজের প্রতি যেমন জাস্টিস করতে পারেন না, তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিও তা করতে পারেন না’ যোগ করেন আসাদুজ্জামান।
বিচারকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা আপনাদের কর্মের মধ্য দিয়ে, কলমের মাধ্যমে প্রজাতন্ত্রের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন। আমরা চাই, আপনারা নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবেন।’
জুডিসিয়ারিকে জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গায় নিয়ে যেতে সরকারের অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এদেশে আর শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ চাই না। আমরা চাই না কোনো বিচারকের নেতিবাচক আচরণের কারণে গোটা জুডিসিয়ারির ওপর মানুষের ক্ষোভ ফিরে আসুক।’
প্রধান বিচারপতির বাসভবন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আইন অঙ্গনসহ দেশের মানুষের কাছে এটি তীর্থস্থানের মতো সম্মানজনক জায়গা। এই প্রতিষ্ঠান যেন আর কখনো মানুষের ক্ষোভ, আক্রমণ বা অবমাননার প্রতীক না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
আসাদুজ্জামান আরও বলেন, ‘আইনমন্ত্রী হিসেবে এখন নিজেকে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুলিশ ও প্রশাসনের অনেকের চাকরি চলে গেছে ও অনেকে জেলে গেছেন। যারা সন্ধ্যার পরে রাত ১২টা-১টায় মোমবাতি জ্বালিয়ে বিরোধী পক্ষকে দমন-পীড়নের জন্য বিচারকার্য সম্পাদন করেছেন, আইন মন্ত্রণালয় তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিয়েছে—এটা এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখছি, কারা এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কারণ জনগণ আমাদের ম্যান্ডেট দিয়েছে, তাদের কাছে আমাদের জবাবদিহিতার বিষয় আছে।’
নিজের দায়িত্ব পালনে আপসহীন থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিটি মুহূর্তে আমার দায়িত্বের সীমারেখা সম্পর্কে অবগত আছি। যখন যে দায়িত্বই আমার কাঁধে অর্পিত হয়েছে, সেখানে কখনোই সঠিক সিদ্ধান্তের জায়গা থেকে পিছিয়ে আসিনি, ভবিষ্যতেও আসব না।’
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিভঙ্গির কথা উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রী একটা কথা বলেন, যেটা আমরা সবসময় অনুসরণ করার চেষ্টা করি। তিনি বলেন, আমাদের কাজের জায়গাটা হবে দায়িত্ববোধের, সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার—জনপ্রিয়তার নয়। তাই সব ধরনের অবস্থায় সবসময় সঠিক পথটি বেছে নিতে হবে।’ প্রশিক্ষণার্থী বিচারকদেরও জনপ্রিয়তার পরিবর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি। এক্ষেত্রে তাদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন তিনি।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, আর্থিক কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক—কোনো ধরনের দুর্নীতিকেই প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। বিচারকদেরও এ বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।
দুর্নীতি নিয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘আমরা যদি দুর্নীতি প্রতিরোধে ব্যর্থ হই, তাহলে এই প্রতিষ্ঠানকে সামনের দিকে নিয়ে যাওয়ার সংগ্রাম, বাংলাদেশের মানুষের ন্যায়বিচারের ক্ষেত্র প্রস্তুত করার দীর্ঘদিনের সংগ্রাম, আইনের শাসন আর মানবাধিকার সবই ব্যর্থ হবে। আর আমরা আগামী প্রজন্মের দিকে তাকিয়ে সেই ব্যর্থতার দায়ভার নিতে চাই না। আর যদি সেটা হয়, তাহলে সেটা হবে ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায়।’
বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক (অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি) মো. এমদাদুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আইন ও বিচার বিভাগের সচিবের দায়িত্ব পালনরত অতিরিক্ত সচিব মো. খাদেম উল কায়েস ও বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের পরিচালক (প্রশিক্ষণ) আল আসাদ মো. আসিফুজ্জামান বক্তৃতা করেন।
অনুষ্ঠানে আইন ও বিচার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এস এম এরশাদুল আলমসহ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন, আইন কমিশন এবং বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ভিওডি বাংলা/এফএ







