ঢাবিতে হলের পানি পানে তিন শতাধিক শিক্ষার্থী অসুস্থ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলে পানিবাহিত রোগের উপসর্গ নিয়ে ছাত্রীদের অসুস্থ হওয়ার ঘটনা থামছে না। গত দুই সপ্তাহে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. মোহাম্মদ মোর্তজা মেডিকেল সেন্টার ও হলে বসানো মেডিকেল ক্যাম্প থেকে হলের শতাধিক শিক্ষার্থী চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে কী কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি হল প্রশাসন। তাদের দাবি, পানি পরীক্ষা করেও কোনো জীবাণু পাওয়া যায়নি। আবারও পানি পরীক্ষার জন্য নমুনা দেওয়া হয়েছে। তবে চিকিৎসকরা বলছেন লক্ষণ দেখে মনে হচ্ছে এটি পানিবাহিত রোগ।
হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মাহবুবা সুলতানা বলেন, হলটি প্রতিষ্ঠার পর সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। তবে পরবর্তীতে সামনে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল তুলনামূলক উঁচু করে নির্মাণ হওয়ায় বৃষ্টি হলেই মৈত্রী হল এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। স্থাপনাগুলো পুরোনো ও দীর্ঘদিন পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সংস্কার না হওয়ায় পানি নামতেও সময় লাগে। এতে হলের সামনে ও আশপাশে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ থাকে। একই অভিযোগ শিক্ষার্থীদেরও।
এ বিষয়ে পূর্ববর্তী বিভিন্ন গবেষণাতেও একই ধরনের আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ জার্নাল অব মাইক্রোবায়োলজিতে প্রকাশিত এক গবেষণায় ঢাকা শহরের সরবরাহ করা পানিতে ই-কোলাই ও কোলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত হওয়ার তথ্য উঠে আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের গবেষক ড. সংযুক্তা আহসান ও অনিন্দিতা ভৌমিক পরিচালিত গবেষণাটিতে বলা হয়, পুরোনো ও লিকেজযুক্ত পাইপলাইনে পানি সরবরাহ লাইনের মাধ্যমে পয়োবর্জ্য মিশে পানিদূষণ ঘটতে পারে, যা পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
এছাড়া ২০২১ সালে জার্নাল অব হেলথ, পপুলেশন অ্যান্ড নিউট্রিশন-এ প্রকাশিত আইসিডিডিআর,বি’র এক গবেষণায় বলা হয়, বর্ষাকাল ও জলাবদ্ধতার সময় সরবরাহ লাইনে জীবাণু দূষণের ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া যুগান্তরকে বলেন, আমাদের ব্যবহারের পানি সাধারণত মাটির অনেক গভীর থেকে আসে। এক্ষেত্রে জলাবদ্ধতার পানি ভূগর্ভের ১০০ থেকে ১৫০ মিটারের বেশি নিচে যেতে পারে না। তবে জলাবদ্ধতায় সৃষ্ট জীবাণু হলের পানি সরবরাহের পাইপলাইন ও পয়োনিষ্কাশনের পাইপলাইনের লিকেজের মাধ্যমে পানিতে মিশতে পারে।
অধ্যাপক ড. সংযুক্তা আহসান বলেন, হলে পানির সমস্যায় কারণ হিসাবে কী ধরনের ফিল্টার ব্যবহার করা হচ্ছে, কতদিন পরপর পরিবর্তন করা হচ্ছে এটি বেশি যুক্তিযুক্ত। ফিল্টার পরিবর্তনের পরেও পানির সমস্যার সমাধান না হলে পাইপলাইন পরিবর্তন করতে হবে।
জানা যায়, বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলে পানি সরবরাহ করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ হোস্টেলসংলগ্ন আইয়ুব আলী কলোনির পাম্প থেকে। এই পাম্প থেকে পানি দেওয়া হয় বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলেও। পাশাপাশি অবস্থিত দুটি হলের পানির উৎস এক হলেও শুধুমাত্র কুয়েত মৈত্রী হলে শিক্ষার্থীদের পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তাই প্রশ্ন জাগছে জলাবদ্ধতা ও পাইপলাইনের লিকেজ থেকেই এ সমস্যার উদ্ভব হয়েছে কিনা।
দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতার কারণে হলের অভ্যন্তরীণ পানির সংযোগ ও পাইপলাইনে পানিবাহিত রোগের জীবাণু জন্মেছে কিনা এমন প্রশ্নে প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মাহবুবা সুলতানা বলেন, পাইপলাইন ইতোমধ্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। তবে এমন কোনো কিছু পাওয়া যায়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মোহাম্মদ ড. মোর্তজা মেডিকেল সেন্টারের প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা তানভীর আলী যুগান্তরকে বলেন, গত রোববারের পর থেকে পানিবাহিত রোগের উপসর্গ নিয়ে শিক্ষার্থীদের আসা কমেছে। পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক। তিনি বলেন, মেডিকেল সেন্টার থেকে অন্তত ৬০ শিক্ষার্থী চিকিৎসা নিয়েছেন। তারা ডায়রিয়া, বমি ও পেটব্যথায় আক্রান্ত ছিলেন।
তবে হলের শিক্ষার্থীরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের অভিযোগ, প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে বহু শিক্ষার্থী পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। বিষয়টি হল প্রশাসনকে জানানো হলে স্বাস্থ্যসেবার জন্য নির্দিষ্ট কোনো বাজেট নেই বলে জানানো হয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে বুধবার রাত ১২টার দিকে তিন দফা দাবিতে হল গেটের সামনে সড়কে বিক্ষোভ করেন আবাসিক শিক্ষার্থীরা।
ভুক্তভোগী এক শিক্ষার্থী বলেন, আমি গুরুতর অসুস্থ হওয়ার পর কাউকে পাচ্ছিলাম না, কারণ সবাই অসুস্থ। পরে কয়েকজন বন্ধু আমাকে মেডিকেলে নিয়ে যায়। সেখানে যে ওষুধ লিখে দেওয়া হয়, সেগুলোর একটিও মোর্তজা মেডিকেলে পাওয়া যায়নি। আমরা প্রতি বর্ষে ভর্তির সময় স্বাস্থ্য খাতে টাকা দিই, তাহলে সেই টাকা কোথায় যায়? প্রশাসনের কাছে এ প্রশ্নের জবাব চাই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ইসরাফিল রতন বলেন, বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও উদ্বিগ্ন। কেন এমনটা হচ্ছে, তা বোঝার চেষ্টা চলছে। পরিচ্ছন্নতা থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান এ বিষয়ে যেন কোনো গুজব ও অপতথ্য না ছড়ানো হয়। আমরা বিশ্বাস করতে চাই না যে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে পানি দূষণের ঘটনা ঘটিয়েছে।
ভিওডি বাংলা/বিন্দু







