• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১
  • live

কেমন ছিল জিয়াউর রহমানের ৪৫ বছরের জীবন

নিজস্ব প্রতিবেদক    ৩০ মে ২০২৬, ০১:৫৯ এ.এম.
ছবি: সংগৃহীত

লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর উত্তম (১৯৩৬-১৯৮১) ছিলেন স্বাধীনতার ঘোষক এবং বাংলাদেশের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সেনাপ্রধান এবং বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা। সেই সঙ্গে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।

প্রথম জীবন

জিয়াউর রহমান, যাকে আদর করে জিয়া বলা হয়, ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়ার বাগবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মনসুর রহমান ছিলেন কলকাতার একটি সরকারি বিভাগে কর্মরত একজন রসায়নবিদ। তার শৈশব কেটেছে আংশিক বগুড়ার গ্রামাঞ্চলে এবং আংশিক কলকাতায়। ভারত বিভাজনের পর (১৯৪৭) তার পিতা করাচিতে স্থানান্তরিত হলে জিয়াকে কলকাতার হেয়ার স্কুল ছেড়ে করাচিতে একাডেমি স্কুলের ছাত্র হতে হয়। তিনি ১৯৫২ সালে সেই স্কুল থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করেন। ১৯৫৩ সালে তিনি করাচির ডিজে কলেজে ভর্তি হন। একই বছর তিনি কাকুলে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে অফিসার ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন।

সামরিক জীবন

জিয়াউর রহমান ১৯৫৫ সালে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশন লাভ করেন। তিনি সেখানে দুই বছর দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৫৭ সালে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে স্থানান্তরিত হন। তিনি ১৯৫৯ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত সামরিক গোয়েন্দা বিভাগেও কাজ করেন। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে জিয়াউর রহমান একটি কোম্পানির কমান্ডার হিসেবে খেমকারান সেক্টরে যুদ্ধ করেন। প্রসঙ্গত, তার কোম্পানি যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ কর্মদক্ষতার জন্য সর্বাধিক সংখ্যক বীরত্বের পুরস্কার পেয়েছিল। তিনি ১৯৬৬ সালে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে একজন প্রশিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। একই বছরে তাকে ‘কমান্ড’ কোর্সে যোগদানের জন্য কোয়েটার স্টাফ কলেজে পাঠানো হয়। ১৯৬৯ সালে তিনি জয়দেবপুরে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে যোগদান করেন। তিনি পশ্চিম জার্মানি থেকে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৭০ সালে দেশে ফেরার পর জিয়াউর রহমান, তৎকালীন একজন মেজর, চট্টগ্রামের অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে বদলি হন।

স্বাধীনতাযুদ্ধে বীরত্ব

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ঘুমন্ত নিরস্ত্র জনগণের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায় এবং ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা চালায়। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে নৃশংস এ গণহত্যা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পরিচিত।

মেজর জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। এরপর ২৬ মার্চ বেতার কেন্দ্রের কর্মীদের সহায়তায় চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ‘আমি বাংলাদেশ লিবারেশন আর্মির অস্থায়ী সর্বাধিনায়ক মেজর জিয়া, এতদ্বারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি।’

জিয়াউর রহমান ও তার সৈন্যরা এভাবেই মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখভাগে আসেন। মেজর জিয়া এবং তার নেতৃত্বাধীন সশস্ত্র বাহিনী চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী এলাকাকে কয়েকদিন তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং পরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চাপের মুখে কৌশলগত পশ্চাদপসরণ হিসেবে সীমান্ত অতিক্রম করে।

জিয়াউর রহমান প্রাথমিকভাবে বিডিএফ সেক্টর-১ এর বাংলাদেশ ফোর্সেস কমান্ডার হন এবং জুন থেকে বিডিএফ সেক্টর-১১ এর বিডিএফ কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালের জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে তিনি জেড ফোর্সের ব্রিগেড কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালের ২৮ আগস্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাত থেকে পুনরুদ্ধার করা রৌমারীতে প্রথম বেসামরিক প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করেন। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বীরত্ব পুরস্কার ‘বীর উত্তম’-এ ভূষিত হন।

অপরিহার্য রাজনৈতিক উত্থান

নয় মাসের যুদ্ধে সবচেয়ে প্রশংসনীয় কর্মদক্ষতার পর জিয়া কুমিল্লায় ব্রিগেড কমান্ডার নিযুক্ত হন। ১৯৭২ সালের জুন মাসে তাকে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ করা হয়। ১৯৭৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে তিনি ব্রিগেডিয়ার এবং বছরের শেষের দিকে মেজর জেনারেল হন। জিয়াউর রহমান ২৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে সেনাপ্রধান হন। খালেদ মোশাররফ যখন শাফাত জামিলের নেতৃত্বে ঢাকা ব্রিগেডের সমর্থনে ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে একটি অভ্যুত্থান ঘটান, তখন জিয়াউর রহমান তার কমান্ড পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং গৃহবন্দি হন। ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতা বিপ্লব তাকে রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর জিয়াউর রহমানকে পুনরায় সেনাপ্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে একই দিনে সেনা সদর দপ্তরে এক বৈঠকে বিচারপতি এএসএম সায়েমকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং তিন বাহিনীর প্রধান, মেজর জেনারেল জিয়াকে বিমানবাহিনী প্রধান হিসেবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরিচালনার জন্য একটি নতুন প্রশাসনিক কাঠামো সাজানো হয়। উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে ছিলেন ভাইস মার্শাল এমজি তোয়াব এবং রিয়ার অ্যাডমিরাল এমএইচ খান। জিয়াউর রহমান ১৯ নভেম্বর ১৯৭৬ সালে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন, যখন বিচারপতি সায়েম তার পদ ত্যাগ করেন। শেষ পর্যন্ত ২১ এপ্রিল ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি সায়েম পদত্যাগ করলে তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন।

স্বপ্নদ্রষ্টা রাষ্ট্রনায়ক

রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর জিয়াউর রহমান সংবিধানের প্রস্তাবনায় ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ (‘পরম করুণাময়, অসীম দয়াবান আল্লাহর নামে’) সন্নিবেশ করার জন্য সংবিধান সংশোধন করে একটি রাষ্ট্রপতি আদেশ জারি করেন। অনুচ্ছেদ ৮(১) এবং ৮(১এ)-এ ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ নীতি যোগ করা হয়। অনুচ্ছেদ ৮(১)-এ সমাজতন্ত্রকে ‘অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। অনুচ্ছেদ ২৫(২)-এ বলা হয়, ‘রাষ্ট্র ইসলামি সংহতির ভিত্তিতে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক সুসংহত, সংরক্ষণ ও শক্তিশালী করার চেষ্টা করবে।’

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমান নিজেকে চেয়ারম্যান করে একটি নতুন রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি গঠন করেন। ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশের দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং বিএনপি ৩০০টির মধ্যে ২০৭টি আসনে জয়লাভ করে। ১ এপ্রিল ১৯৭৯ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হয়। ৯ এপ্রিল পঞ্চম সংশোধনী কার্যকর হওয়ার পর সামরিক আইন প্রত্যাহার করা হয়। জিয়াউর রহমান আবার নির্বাচনী রাজনীতি চালু করে দেশকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে সক্ষম হন, যা ছিল তার নেতৃত্বের বড় অর্জন।

জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের জনগণের একটি নতুন জাতীয় পরিচয় হিসেবে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ প্রবর্তন করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, বাংলাদেশের মতো একটি বহুজাতিক সমাজে যেখানে মানুষ বিভিন্ন জাতিসত্তার, বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাস, সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য ও জীবনধারার অনুসারী, সেখানে জাতীয়তাবাদকে ভাষা বা সংস্কৃতির পরিবর্তে ভূখণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে ধারণা করা উচিত। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী, লিঙ্গ, সংস্কৃতি ও জাতি নির্বিশেষে বাংলাদেশের সব নাগরিকের জাতীয় ঐক্য ও একীকরণের ওপর জোর দেয়।

স্বাধীনতা-উত্তর সরকারের আমলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। ক্ষমতা গ্রহণের পর জিয়া অবিলম্বে দেশের আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার এবং পুলিশ বাহিনীকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেন। কার্যত এর আকার দ্বিগুণ করে ৪০ হাজার থেকে ৭০ হাজারে উন্নীত করা হয় এবং যথাযথ প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। তিনি সশস্ত্র বাহিনীতেও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন। এ উদ্দেশ্যে কঠোর প্রশিক্ষণ ও শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে তাদের মধ্যে পেশাদারিত্ব বিকাশের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৭৪-৭৫ সালে ৫০ হাজারের কম থেকে ১৯৭৬-৭৭ সালে প্রায় ৯০ হাজারে বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি করেন। যদিও জিয়া সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারে সফল হয়েছিলেন, তবুও বিভিন্ন বিদ্রোহ ও অভ্যুত্থানচেষ্টার কারণে তাকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হয়েছিল।

উচ্ছৃঙ্খল সেনাবাহিনীর মাঝে জিয়া দৃঢ় ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, দেশ যত দ্রুত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে যাবে ততই দেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে। তিনি নির্বাচনের প্রতিষ্ঠান পুনরুদ্ধার করে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ সহজ করেন। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে জিয়া ভেঙে পড়া ও বিশৃঙ্খল রাজনৈতিক দলগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করার অনুমতি দেন এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরায় চালুর সুযোগ করে দেন। ফলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আবারও রাজনীতি করার সুযোগ পায়।

এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে জিয়া সংবাদপত্রের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে তথ্য মাধ্যমকে মুক্ত ও নিরবচ্ছিন্ন করেন। সংবাদের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা হয়। বিরাজমান পরিস্থিতি তাকে সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নিতে প্ররোচিত করে। তিনি বিশ্বাস করতেন, স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুদ্ধার ও দলগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

অর্থনৈতিক সংস্কার

রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিয়াউর রহমান জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তার অর্থনৈতিক নীতি বেসরকারি খাতের উন্নয়নের ওপর জোর দেয়, যা আগে অবহেলিত ছিল। তিনি বিশেষজ্ঞদের একটি দলকে বেসরকারি খাতের উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক অগ্রগতির পরিকল্পনা প্রণয়নের দায়িত্ব দেন। পাশাপাশি কৃষকদের ভর্তুকি এবং কৃষি বিপণনের মাধ্যমে কৃষি উন্নয়নের সূচনা করেন। তিনি জাতীয়করণকৃত শিল্পগুলোকে তাদের সাবেক মালিকদের কাছে হস্তান্তরের জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

রপ্তানি খাতের উন্নয়নে তিনি প্রচলিত ও অপ্রচলিত পণ্য রপ্তানির প্রসারে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। জিয়ার অর্থনৈতিক নীতি তাকে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এনে দেয়। খাদ্য উৎপাদন নতুন উচ্চতায় পৌঁছায় এবং বাংলাদেশ অদূর ভবিষ্যতে চালের উদ্বৃত্ত দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে।

জিয়াউর রহমানের কর্মপরিকল্পনায় একটি ১৯ দফা কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা দেশে দ্রুত আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের ওপর জোর দেয়। উন্নয়ন প্রচেষ্টায় জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক রূপান্তর এবং স্বনির্ভরতা ও গ্রামীণ উন্নয়ন সাধনই ছিল এ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য। এর প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল কৃষি প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ এবং বেসরকারি খাতে বৃহত্তর প্রণোদনা।

এ কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ এবং নারী, যুবক ও শ্রমিকদের বিশেষ চাহিদা মেটানো। একই সঙ্গে সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করাও ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য।

তার অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য রাষ্ট্রপতি জিয়া দেশের রাজনীতিকে উন্নয়নমুখী রাজনীতিতে রূপান্তরের চেষ্টা করেন। সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে শুধু উৎপাদন নয়, এর আরও বহুমাত্রিক প্রভাব রয়েছে বলে তিনি মনে করতেন। তিনি কর্মসূচিগুলোকে বিপ্লব হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং দলের নেতাকর্মীদের উন্নয়ন অভিযানে সক্রিয় অংশগ্রহণে উৎসাহিত করেন।

এর মধ্যে প্রথম ছিল খাল খনন কর্মসূচি, যা বিশেষ করে খরা মৌসুমে কৃষকদের পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য পরিকল্পনা করা হয়েছিল। দ্বিতীয়টি ছিল নিরক্ষরতা দূরীকরণ কর্মসূচি, যাতে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমে সমাজে শিক্ষার বিস্তার ঘটে। মাঠ ও কারখানা উভয় ক্ষেত্রে উৎপাদন বৃদ্ধির জন্যও বিভিন্ন কর্মসূচি চালু করা হয়।

পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিকে জোরদার করা হয়, যাতে জনসংখ্যাকে অর্থনৈতিক ও টেকসই উন্নয়নের জন্য উপযোগী পর্যায়ে স্থিতিশীল রাখা যায়। গ্রাম সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্বনির্ভর বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যও সামনে আনা হয়।

তিনি তার কর্মসূচিকে শুধু রাজনৈতিক স্লোগানে সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন। দেড় বছরে ১৫০০টির বেশি খাল খনন ও পুনঃখনন, পরপর দুই বছরে (১৯৭৬-৭৭ এবং ১৯৭৭-৭৮) খাদ্যশস্যের রেকর্ড উৎপাদন, ১৯৭৬-৭৮ সালে গড় বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৪ শতাংশ, গণশিক্ষা অভিযান, গ্রাম সরকার এবং গ্রাম প্রতিরক্ষা পার্টি (ভিডিপি) চালুর মাধ্যমে জনগণের মনে গভীর ছাপ ফেলেন। দাতা সংস্থাগুলোও তার সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পে সন্তোষ প্রকাশ করে।

আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব

ভারত ও অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় দেশের সঙ্গে সুপ্রতিবেশী সম্পর্ক স্থাপনের লক্ষ্যে জিয়া প্রথমে জনগণের জাতীয়তাবাদী আকাঙ্ক্ষার পুনরুত্থান ঘটান এবং পরে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করেন।

পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য নতুনভাবে নির্ধারণ করে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে শান্তি ও অগ্রগতি অর্জনের লক্ষ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা হয়। আঞ্চলিক পর্যায়ে বাংলাদেশ ভারতের পাশাপাশি পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তোলে, যা পরবর্তীতে আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ ডান, বাম ও মধ্যপন্থি সব ধরনের রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করে। বাংলাদেশ মুসলিম বিশ্বের কাছাকাছি আসে, যারা বাংলাদেশ ও এর সমস্যাগুলোকে নতুনভাবে দেখতে শুরু করে।

চীন ও আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের কার্যকর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক উন্নত হয়। তিনি বহু আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দেন এবং বহুপাক্ষিক ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন দেশ সফর করেন।

তার উদ্যোগের ফল ছিল ইতিবাচক। বাংলাদেশ ১৯৭৮ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হয় এবং জাতিসংঘের কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। রাষ্ট্রপতি জিয়া দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণার সূচনা করেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি ১৯৭৯-৮০ সালে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ সফর করেন। তার প্রচেষ্টার ফল হিসেবে সাউথ এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর রিজিওনাল কো-অপারেশন (সার্ক) প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়, যা আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৮৫ সালে ঢাকায় যাত্রা শুরু করে।

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে সেনা অভ্যুত্থানে তাকে হত্যা করা হয়। ঢাকার শেরেবাংলা নগরে তাকে সমাহিত করা হয়।

সূত্র: বিএনপি মিডিয়া সেল

ভিওডি বাংলা/আরআর/এমএস 

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
জামিনে বেরিয়েই ফের জড়িয়ে পড়ছে পুরনো অপরাধে
জামিনে বেরিয়েই ফের জড়িয়ে পড়ছে পুরনো অপরাধে
চার মাসে ধর্ষণসহ শিশু নির্যাতনের ৭৩ ঘটনায় মামলা হয়নি
চার মাসে ধর্ষণসহ শিশু নির্যাতনের ৭৩ ঘটনায় মামলা হয়নি
তারেক রহমানের খাল খননে ফিরছে নদীর প্রাণ
তারেক রহমানের খাল খননে ফিরছে নদীর প্রাণ