• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১
  • live

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তামাকখাতকে কেবল রাজস্বের চোখে দেখার সুযোগ নেই

মোঃ আজহার আলী তালুকদার    ১ জুন ২০২৬, ১০:০৫ পি.এম.
মোঃ আজহার আলী তালুকদার

বাংলাদেশে তামাকের প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা হলেই একটি চিরাচলিত কূটকৌশল সামনে আনা হয়—তামাক কোম্পানিগুলো দেশের অন্যতম বড় করদাতা। বাজেটের সময় এ প্রচারণা আরও জোরালো হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে খাত বছরে লাখো মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়, স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বিশাল চাপ তৈরি করে এবং অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তাকে কি শুধু রাজস্ব আয়ের উৎস হিসেবে দেখা যায়? বাস্তবতা হচ্ছে, তামাকখাত থেকে সরকার যে রাজস্ব পায়, তার চেয়ে অনেক বেশি অর্থ হারায় তামাক ব্যবহারজনিত চিকিৎসা ব্যয়, উৎপাদনশীলতা হ্রাস এবং পরিবেশগত ক্ষতির কারণে।

তামাক কোম্পানি মূলত ভোক্তার কাছ থেকে কর সংগ্রহ করে সরকারের কাছে জমা দেয়। উদাহরণ হিসেবে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ ২০২৪ সালে প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকা কর দিয়েছে বলে প্রচার করা হয়। কিন্তু এর মধ্যে প্রত্যক্ষ কর বা আয়করের অংশ ছিল মাত্র ৫.২৭ শতাংশ; বাকি প্রায় ৯৫ শতাংশই ছিল ভোক্তার দেওয়া পরোক্ষ কর। অর্থাৎ কর দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ, তামাক কোম্পানি নয়।

এছাড়াও, তামাক খাত থেকে যে রাজস্ব আসে, তার চেয়ে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি। জন হপকিন্স ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথের গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৪ সালে তামাক ব্যবহার ও উৎপাদনের ফলে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে তামাক খাত থেকে রাজস্ব আয় হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ক্ষতির পরিমাণ রাজস্ব আয়ের তুলনায় প্রায় ১১৫ শতাংশ বেশি। তামাকে ব্যয় হওয়া এই অর্থ যদি শিক্ষা, পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা বা অন্যান্য উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হতো, তাহলে সেই অর্থও অর্থনীতিতে অবদান রাখত এবং সরকার সেখান থেকেও রাজস্ব পেত। তাই “তামাক কোম্পানি রাজস্ব দেয়”—এই প্রচারণা দিয়ে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিকে আড়াল করা উচিত নয়।

জনস্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বাংলাদেশ এখন বিশ্বের অন্যতম উচ্চ তামাক ব্যবহারকারী দেশ। গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে ২০১৭ অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি—৩৫.৩ শতাংশ। তুলনামূলকভাবে ভারতে এই হার ২৮.৬ শতাংশ এবং পাকিস্তানে ১৯.১ শতাংশ। দেশে প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লক্ষ মানুষ তামাক ব্যবহার করে এবং প্রতিবছর প্রায় ২ লক্ষ মানুষ তামাকজনিত রোগে মারা যায়। টোব্যাকো অ্যাটলাস ২০২৫ থেকে আরও জানা যায়, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ১৮ শতাংশের পেছনে তামাক দায়ী। অথচ এত ভয়াবহ পরিস্থিতির পরও বাংলাদেশে সিগারেট এখনও অত্যন্ত সস্তা এবং সহজলভ্য।

তামাক সহজলভ্য থাকার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ দেশের বিদ্যমান তামাক কর কাঠামো। বর্তমানে দেশে সিগারেটের চারটি মূল্যস্তর—নিম্ন, মধ্যম, উচ্চ ও অতি উচ্চ। এই বহুস্তরবিশিষ্ট অ্যাড ভ্যালোরেম কর পদ্ধতি কার্যকর তামাক নিয়ন্ত্রণে বাধা তৈরি করছে। কারণ দাম বাড়লেও ভোক্তারা সহজেই এক স্তরের সিগারেট থেকে আরেক স্তরের অপেক্ষাকৃত সস্তা সিগারেটে চলে যেতে পারছে। এতে ধূমপান কমছে না, বরং সস্তা সিগারেটের বাজার আরও বিস্তৃত হচ্ছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য মতে, ২০০৬-০৭ অর্থবছরে নিম্নস্তরের সিগারেটের বাজার অংশীদারত্ব ছিল ২৫ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৬ শতাংশে। অর্থাৎ বাংলাদেশের সিগারেট বাজার এখন ক্রমেই সস্তা সিগারেটনির্ভর হয়ে উঠছে। এর প্রধান শিকার তরুণ ও নিম্ন আয়ের মানুষ, যাদের কাছে কমদামের সিগারেট খুব সহজেই পৌঁছে যাচ্ছে।

সমস্যাটি আরও গভীর হয়েছে কারণ বাংলাদেশে তামাকপণ্যের খুচরামূল্যকেই করারোপের ভিত্তিমূল্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু দেশে সিগারেটের বেজ প্রাইস বা ভিত্তিমূল্য এত কম যে করহার তুলনামূলকভাবে বেশি দেখালেও তা বাস্তবে সিগারেটের ব্যবহার কমাতে বা রাজস্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে বিদ্যমান কর কাঠামো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল টোব্যাকো এপিডেমিক ২০২৫ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৮৬টি দেশের মধ্যে শ্রীলঙ্কায় ২০ শলাকার এক প্যাকেট সিগারেটের দাম সবচেয়ে বেশি—৩৪.৩৮ ডলার, যেখানে করহার ৬৮.৩৭ শতাংশ। অন্যদিকে বাংলাদেশের অবস্থান দামের দিক দিয়ে ১৫২তম; এখানে একই প্যাকেটের দাম মাত্র ৩.৪৮ ডলার, যদিও করহার ৫৮.৪ শতাংশ। অর্থাৎ করহার তুলনামূলকভাবে কম না হলেও কম ভিত্তিমূল্যের কারণে বাজারে সস্তা সিগারেট টিকে যাচ্ছে। এই বাস্তবতার মধ্যেই তামাক কোম্পানিগুলো আরেকটি বহুল ব্যবহৃত কূটকৌশল সামনে আনে—তামাকপণ্যের দাম বাড়ালে নাকি অবৈধ বাণিজ্য বা চোরাচালান বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু বাস্তব তথ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে অবৈধ সিগারেট বাণিজ্যের হার মাত্র ১.৮ শতাংশ, যেখানে ভারতে এটি ১৭ শতাংশ, পাকিস্তানে ৩৮ শতাংশ এবং মালয়েশিয়ায় ৩৬ শতাংশ। ফলে উচ্চ করহার বা মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে চোরাচালানের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। তাই অবৈধ বাণিজ্যের ভয় দেখিয়ে তামাকপণ্যে কার্যকর করারোপ আটকে রাখার প্রচেষ্টা মূলত নীতিনির্ধারকদের বিভ্রান্ত করার কৌশল ছাড়া কিছু নয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মূল্যস্ফীতি ও আয় বৃদ্ধির তুলনায় সিগারেটের দাম বাড়েনি। ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশে পারিবারিক আয় বেড়েছে ১০৩ শতাংশ এবং মাথাপিছু আয় বেড়েছে ৯৩ শতাংশ। একই সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের জুলাইয়ের তুলনায় ২০২৩ সালের জুলাইয়ে খোলা চিনির দাম বেড়েছে ৮৯ শতাংশ, আলু ৮৭ শতাংশ, খোলা আটা ৭৫ শতাংশ, পাঙ্গাস মাছ ৪৭ শতাংশ, ডিম ৪৩ শতাংশ, সয়াবিন তেল ৩৪ শতাংশ, গুঁড়ো দুধ ৩০ শতাংশ এবং ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে ২৭ শতাংশ। অথচ একই সময়ে বিভিন্ন স্তরের সিগারেটের দাম বেড়েছে মাত্র ৬ থেকে ১৫ শতাংশ। বিশেষ করে নিম্নস্তরের সিগারেটের দাম মূল্যস্ফীতি ও আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে না বাড়ায় তরুণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে সিগারেট আরও সহজলভ্য হয়ে উঠেছে।

এই বাস্তবতায় মূল্যস্ফীতি ও আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তামাকপণ্যে কার্যকর করারোপের মাধ্যমে মূল্য বৃদ্ধি এখন আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং কম কর-জিডিপি অনুপাতের কারণে সরকার রাজস্ব চাপে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে তামাক খাত কার্যকর রাজস্ব সংস্কারের একটি বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাব অনুযায়ী, আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে নিম্ন ও মধ্যম স্তর একত্র করে প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের প্যাকেটের খুচরা মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণ করা, উচ্চ স্তরে ১৫০ টাকা এবং অতি উচ্চ স্তরে ২০০ টাকা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে সকল স্তরে প্রতি প্যাকেটে ৪ টাকা সুনির্দিষ্ট (স্পেসিফিক) কর আরোপ এবং খুচরা মূল্যের ওপর ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক, ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ১ শতাংশ স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ বহাল রাখা জরুরি।

এই প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে একদিকে যেমন তামাকখাত থেকে ৮৫ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আয় সম্ভব হবে, অন্যদিকে প্রায় ৫ লক্ষ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপান ছাড়তে উৎসাহিত হবে এবং ৩ লক্ষ ৭২ হাজারের বেশি তরুণ ধূমপান শুরু করা থেকে বিরত থাকবে। অর্থাৎ এটি শুধু রাজস্ব বৃদ্ধির প্রস্তাব নয়; এটি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা এবং স্বাস্থ্যখাতের ওপর চাপ কমানোর একটি কার্যকর নীতি।

সবশেষে মনে রাখতে হবে, তামাক কর বৃদ্ধি কেবল অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি মানুষের জীবন রক্ষার সিদ্ধান্ত। তামাকের কারণে ক্যানসার, হৃদরোগ, স্ট্রোক ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার। একজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তামাক ব্যবহারজনিত রোগে আক্রান্ত হলে পুরো পরিবার অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে যায়। তাই তামাক নিয়ন্ত্রণকে শুধু রাজস্বের প্রশ্ন হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে জনস্বাস্থ্য, দারিদ্র্য হ্রাস এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রশ্ন হিসেবেও দেখতে হবে। তাই জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতিকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে তামাকপণ্যে উচ্চ করারোপ করে মূল্যবৃদ্ধি করুন, সস্তা সিগারেটের ফাঁদ থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষা নিশ্চিত করুন। 

মোঃ আজহার আলী তালুকদার
সাবেক যুগ্মসচিব 

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
যে শরীরের উপর নিয়ন্ত্রণ নেই, তার জন্য এত অন্যায় কেন?
যে শরীরের উপর নিয়ন্ত্রণ নেই, তার জন্য এত অন্যায় কেন?
অজানা অ্যাপ ও ফিশিং লিংক: প্রতারণার নতুন প্যাটার্ন
অজানা অ্যাপ ও ফিশিং লিংক: প্রতারণার নতুন প্যাটার্ন
বৈশাখে জেগে উঠুক মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মানবিক অঙ্গীকার
বৈশাখে জেগে উঠুক মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মানবিক অঙ্গীকার