ত্রাণের অর্থ পেলেন জামায়াত এমপির এপিএস ও স্বজনরা

খুলনার কয়রা উপজেলায় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলের অর্থ বিতরণকে কেন্দ্র করে নানা প্রশ্ন ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ঈদুল আজহা উপলক্ষে অসহায় ও নিম্নআয়ের মানুষের সহায়তার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের সুবিধাভোগীদের তালিকায় স্থানীয় সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত সহকারী (এপিএস), আত্মীয়স্বজন এবং দলীয় নেতাকর্মীদের নাম থাকার অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, খুলনা-৬ (কয়রা-পাইকগাছা) আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদের অনুকূলে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে ঈদ উপলক্ষে ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে কয়রা উপজেলায় ২০১ জন উপকারভোগীর মধ্যে ৪ লাখ ১৫ হাজার টাকা বিতরণের তথ্য পাওয়া গেছে। অবশিষ্ট অর্থ পাইকগাছা উপজেলায় বিতরণ করার কথা রয়েছে।
সম্প্রতি সুবিধাভোগীদের তালিকা প্রকাশিত হলে সেখানে বেশ কয়েকজন বিতর্কিত নাম সামনে আসে। তালিকার শুরুতেই রয়েছেন সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠজন ও আত্মীয়স্বজন। তালিকার তৃতীয় স্থানে রয়েছে সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত সহকারী (এপিএস) আবু ওবাইদার নাম। এছাড়া প্রথম স্থানে থাকা আহসান হাবিবকে স্থানীয়রা সংসদ সদস্যের ভাগনে বলে দাবি করেছেন।
এদিকে তালিকায় ছাত্রশিবিরের কয়েকজন নেতার নামও পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরাও রয়েছেন বলে জানা গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকৃত দরিদ্রদের পরিবর্তে রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, সুবিধাভোগীদের মধ্যে বৈষম্যমূলকভাবে অর্থ বিতরণ করা হয়েছে। স্থানীয় কয়েকজন উপকারভোগীর দাবি, তাদের প্রত্যেককে দুই হাজার টাকা করে দেওয়া হলেও কিছু ব্যক্তি চার হাজার টাকা করে পেয়েছেন। যাদের মধ্যে সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠজন, দলীয় নেতাকর্মী ও আত্মীয়স্বজন রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
তালিকাভুক্ত কয়েকজন নারী উপকারভোগী জানান, উপজেলা পরিষদে ডেকে তাদের হাতে দুই হাজার টাকা তুলে দেওয়া হয়। তখন বলা হয়েছিল এটি সংসদ সদস্যের পক্ষ থেকে ঈদ উপলক্ষে সহযোগিতা। পরে অন্যদের বেশি অর্থ দেওয়ার তথ্য জানতে পেরে তারা বিস্ময় প্রকাশ করেন।
তদন্তে আরও জানা গেছে, তালিকায় থাকা কয়েকজন ব্যক্তি আর্থিকভাবে স্বচ্ছল পরিবারের সদস্য। উদাহরণ হিসেবে ছাত্রশিবিরের এক নেতার পরিবারের উল্লেখ করা হচ্ছে, যারা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমিতে চিংড়ি চাষের সঙ্গে জড়িত। একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নামও তালিকায় রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত সহকারী আবু ওবাইদার পরিবারও স্থানীয়ভাবে সচ্ছল হিসেবে পরিচিত। তাঁর স্ত্রী একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। ফলে ত্রাণ সহায়তার তালিকায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আবু ওবাইদা প্রথমে তালিকা প্রকাশ নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি দাবি করেন, তালিকাটি প্রকাশ্যে আসার কথা ছিল না। তবে অর্থ গ্রহণের বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে চাননি।
অভিযোগের বিষয়ে সংসদ সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
অন্যদিকে কয়রা উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর নেতারা অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেননি। উপজেলা জামায়াতের দায়িত্বশীল এক নেতা বলেন, তালিকায় অধিকাংশই দরিদ্র ও অসহায় মানুষ। তবে কিছু দলীয় কর্মীর নাম থাকতে পারে। তাদেরও অনেকেই আর্থিকভাবে অসচ্ছল বলে তিনি দাবি করেন। সংসদ সদস্যের এপিএসের নাম তালিকাভুক্ত হওয়ার বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা আরও জোরালো হয়েছে। উপজেলা বিএনপির এক নেতা অভিযোগ করেন, প্রকৃত দরিদ্রদের বঞ্চিত করে দলীয় কর্মী ও আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে ত্রাণের অর্থ বিতরণ করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, তালিকার অনেকেই আর্থিকভাবে স্বচ্ছল এবং সচেতনভাবেই তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সুশাসন ও নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরাও ঘটনাটিকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন। তাদের মতে, রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে বরাদ্দকৃত সহায়তা বণ্টনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে প্রকৃত উপকারভোগীরা বঞ্চিত হন। পাশাপাশি এতে জনমনে আস্থার সংকট তৈরি হয়।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খুলনা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কুদরত-ই-খুদা বলেন, সরকারি বা রাষ্ট্রীয় সহায়তার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রকৃত দরিদ্র ও অসহায় মানুষের কাছে সুবিধা পৌঁছে দেওয়া। যদি রাজনৈতিক পরিচয়, আত্মীয়তার সম্পর্ক বা ব্যক্তিগত প্রভাবের ভিত্তিতে সহায়তা দেওয়া হয়, তবে তা ন্যায়বিচার ও সুশাসনের পরিপন্থী।
এদিকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিয়ম অনুযায়ী ত্রাণ তহবিলের অর্থ হতদরিদ্র ও অসহায় মানুষের মধ্যে বিতরণের কথা। তবে বিশেষ উৎসব উপলক্ষে সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে যে বরাদ্দ আসে, সেখানে সুবিধাভোগীদের তালিকা প্রণয়নে তাদের প্রতিনিধিদের ভূমিকা থাকে।
কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আব্দুল্লাহ আল বাকী বলেন, এ ধরনের বিশেষ বরাদ্দের ক্ষেত্রে অনেক সময় জনপ্রতিনিধিদের পক্ষ থেকেই তালিকা প্রস্তুত করা হয়। তবে সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রকৃত দরিদ্রদের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
ভিওডি বাংলা/জা







