মহররমে যেসব কাজ থেকে বিরত থাকা উচিত

মহররম ইসলামী হিজরি বছরের প্রথম মাস এবং আল্লাহ তাআলার নিকট মর্যাদাপূর্ণ চারটি হারাম মাসের অন্যতম। এ মাস ইবাদত, তওবা, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ সময়। তবে যুগে যুগে মহররমকে ঘিরে কিছু কুসংস্কার, বিদআত ও শরিয়তবিরোধী কর্মকাণ্ড সমাজে প্রচলিত হয়েছে, যা ইসলামের মূল শিক্ষা থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়।
কোরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে মহররম মাসে প্রচলিত কয়েকটি বর্জনীয় কাজ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো—
১. আশুরাকে শোক ও মাতমের দিবস বানানো
অনেকেই আশুরার দিনকে শোক, বিলাপ ও মাতমের দিন হিসেবে পালন করেন। অথচ ইসলাম কোনো ব্যক্তির মৃত্যু উপলক্ষে স্থায়ী শোকানুষ্ঠান বা মাতমকে সমর্থন করে না।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَطَمَ الْخُدُودَ وَشَقَّ الْجُيُوبَ وَدَعَا بِدَعْوَى الْجَاهِلِيَّةِ
“সে আমাদের দলভুক্ত নয়, যে গালে আঘাত করে, কাপড় ছিঁড়ে এবং জাহেলিয়াতের মতো বিলাপ করে।”
— সহিহ বুখারি, হাদিস: ১২৯৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০৩
অতএব আশুরাকে শোক ও মাতমের দিবস হিসেবে পালন করা সুন্নাহসম্মত নয়।
২. নিজের শরীরে আঘাত করা ও রক্ত ঝরানো
وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا
কিছু সম্প্রদায়ের মধ্যে আশুরার দিনে নিজেদের শরীরে আঘাত করা, শিকল বা ধারালো অস্ত্র দিয়ে রক্তাক্ত করার প্রচলন রয়েছে। ইসলাম আত্মনির্যাতনকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ
“তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংস করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।”
— সুরা নিসা, আয়াত: ২৯
আরও বলেন,
“তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না।”
— সুরা বাকারা, আয়াত: ১৯৫
তাই নিজেকে আঘাত করা বা রক্ত ঝরানো ইসলামে বৈধ নয়।
৩. বিদআত ও মনগড়া ইবাদত চালু করা
মহররম উপলক্ষে বিশেষ নামাজ, নির্দিষ্ট রাকাতের সালাত, বিশেষ জিকির বা বিশেষ অনুষ্ঠানকে ধর্মীয় আমল হিসেবে প্রচার করা হয় অনেক স্থানে। অথচ এসবের পক্ষে সহিহ কোনো দলিল নেই।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ
“যে ব্যক্তি আমাদের দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু নতুন চালু করবে, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।”
— সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৬৯৭
তাই দ্বীনের নামে নতুন ইবাদত উদ্ভাবন করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
৪. বিশেষ খাবার রান্নাকে ধর্মীয় কর্তব্য মনে করা
কিছু এলাকায় আশুরার দিনে বিশেষ খাবার বা খিচুড়ি রান্নাকে ধর্মীয় রীতি হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু কোরআন বা সহিহ হাদিসে আশুরার দিন নির্দিষ্ট কোনো খাবার রান্নার নির্দেশ পাওয়া যায় না।
তবে সাধারণ দান-সদকার উদ্দেশ্যে খাবার বিতরণ করা সওয়াবের কাজ হতে পারে। কিন্তু এটিকে সুন্নাহ বা বাধ্যতামূলক আমল মনে করা ঠিক নয়।
৫. জাল হাদিস ও ভিত্তিহীন ফজিলত প্রচার করা
মহররম এলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মাধ্যমে অসংখ্য ভিত্তিহীন ঘটনা, জাল হাদিস ও মনগড়া ফজিলতের বর্ণনা ছড়িয়ে পড়ে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ
“যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার নামে মিথ্যা বলবে, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়।”
— সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০৭
তাই কোনো বর্ণনা প্রচারের আগে তার সত্যতা যাচাই করা জরুরি।
৬. হারাম মাসের মর্যাদা নষ্ট করে গুনাহে লিপ্ত হওয়া
মহররম হারাম মাস হওয়ায় এ সময়ে গুনাহ, জুলুম, গিবত, মিথ্যা, অশ্লীলতা ও অন্যায় কাজ থেকে বিশেষভাবে দূরে থাকা উচিত।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَلَا تَظْلِمُوا فِيهِنَّ أَنْفُسَكُمْ
“সুতরাং তোমরা এসব সম্মানিত মাসে নিজেদের প্রতি জুলুম করো না।”
— সুরা তাওবা, আয়াত: ৩৬
এ আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে হারাম মাসগুলোতে পাপ থেকে আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে।
উপসংহার
মহররম শোক, কুসংস্কার বা বিদআতের মাস নয়; বরং এটি তওবা, তাকওয়া, আত্মশুদ্ধি ও ইবাদতের মাস। একজন সচেতন মুসলিম কোরআন ও সহিহ সুন্নাহকে মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করেন এবং সব ধরনের বিদআত, কুসংস্কার, মাতম, আত্মনির্যাতন ও ভিত্তিহীন আমল থেকে দূরে থাকেন।
আসুন, আমরা মহররমের প্রকৃত শিক্ষা ধারণ করি এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দেখানো পথে চলার মাধ্যমে এ মাসের বরকত অর্জনের চেষ্টা করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সত্যকে গ্রহণ এবং অসত্য থেকে দূরে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
ভিওডি বাংলা/আ







