• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১
  • live

ড. দিলারা চৌধুরী

‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন না হলে সরকার জনবিচ্ছিন্ন হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক    ২১ জুন ২০২৬, ০৫:৩৩ পি.এম.
প্রেসক্লাবে ‘বর্তমান সরকারের চার মাস: প্রত্যাশা, অর্জন ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য দেন ড. দিলারা চৌধুরী। ছবি: ভিওডি বাংলা

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে সরকার জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে এবং দেশে সাংবিধানিক সংকটের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী। তিনি বলেন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া দেশের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়।

রোববার ২১ জুন জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) আয়োজিত ‘বর্তমান সরকারের চার মাস: প্রত্যাশা, অর্জন ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান আলোচক হিসেবে তিনি এসব কথা বলেন।  

অনুষ্ঠানে সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, অধ্যাপক ড. ওয়াহেদুজ্জামান করিম, অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী, নাগরিক কোয়ালিশনের সহ-সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুরসহ বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন।

ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণেই প্রয়োজনীয় অন্যান্য সংস্কারও এগোচ্ছে না। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এর পেছনে কোনো আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাঁর মতে, সরকার যদি দ্রুত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে, তাহলে জনগণের আস্থা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে।

তিনি বলেন, কৃষকদের জন্য সাময়িক ভাতা বা কার্ডের পরিবর্তে কৃষির আধুনিকায়ন, সংরক্ষণব্যবস্থা উন্নয়ন এবং উৎপাদনশীল বিনিয়োগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে দুর্নীতি দমন, শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের ওপরও জোর দেন তিনি।

সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, অতীতের শাসনামলে বাকস্বাধীনতা সংকুচিত হয়েছে, মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দুর্বল হয়েছে। এসব সংকট থেকে উত্তরণে কার্যকর সংস্কার অপরিহার্য হলেও সরকার এখনো কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোতে পারেনি। তিনি জুলাই সনদ-সংক্রান্ত গণভোটের রায় বাস্তবায়নে গড়িমসিকে গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন।

তিনি আরও বলেন, সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ছিল সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন। জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলির বিচার দ্রুত সম্পন্ন করা এবং জ্বালানি খাতে অনিয়ম ও মজুতদারির অভিযোগ তদন্তেরও দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচিকে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

অধ্যাপক ড. ওয়াহেদুজ্জামান করিম বলেন, সরকার দৃশ্যমান কিছু উদ্যোগের মাধ্যমে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে, কিন্তু প্রকৃত প্রয়োজন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক সংস্কার। তিনি জানান, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে এবং এ খাতে ব্যাপক সংস্কার জরুরি। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারের অনীহাকে তিনি হতাশাজনক বলে উল্লেখ করেন।

অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী বলেন, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই বেশি। তাই প্রত্যাশা ও বাস্তব অর্জনের ব্যবধান যত কমবে, ততই জনগণের আস্থা বাড়বে। তিনি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি, আইন-শৃঙ্খলার উন্নয়ন, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

নাগরিক কোয়ালিশনের সহ-সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর বলেন, সরকারের প্রথম কয়েক মাসে ইতিবাচক কিছু পদক্ষেপ থাকলেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ঘাটতি স্পষ্ট। দুর্নীতি প্রতিরোধ ও আর্থিক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও তিনি মত দেন।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার। তিনি বলেন, সরকারের প্রথম ১২০ দিনের মূল্যায়নে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ দেখা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ, ফ্যামিলি কার্ডের পাইলট কর্মসূচি, কৃষক কার্ড বিতরণ, খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন, বেসরকারি খাত উপদেষ্টা পরিষদ গঠন, কয়েকটি অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তর, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় পদক্ষেপ এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ সম্পন্ন করা। পাশাপাশি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদে বাংলাদেশের প্রার্থীর নির্বাচিত হওয়াকেও তিনি ইতিবাচক অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, এসব উদ্যোগের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে সেগুলো কতটা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছাতে পারছে কি না তার ওপর। তাঁর মতে, জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ কোনো একক রাজনৈতিক দলের দলিল নয়; বরং এটি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও তরুণ প্রজন্মের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। তাই সরকারের উচিত দ্রুত এর বাস্তবায়নের জন্য সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করা।

মূল প্রবন্ধে আরও বলা হয়, সরকারের কিছু সিদ্ধান্ত-বিশেষ করে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিল বা পুনর্বিবেচনা, মানবাধিকার ও দুর্নীতি দমন কমিশন-সংক্রান্ত নীতিগত অবস্থান এবং স্থানীয় সরকারে নিয়োগ প্রক্রিয়া—সংস্কার কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক চাপ, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতার ক্ষেত্রেও আরও কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজন রয়েছে বলে মত প্রকাশ করা হয়।

বক্তারা সর্বসম্মতিক্রমে বলেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জুলাই সনদের মূল অঙ্গীকার বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকার জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় করতে পারে। অন্যথায় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।প্রয়োজনে এটি আরও সংবাদপত্র-উপযোগী প্রথম আলো, সমকাল বা যুগান্তর স্টাইলে সম্পাদনা করেও দেওয়া যেতে পারে।

ভিওডি বাংলা/জা

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়লেন প্রধানমন্ত্রী
মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়লেন প্রধানমন্ত্রী
আগের সরকারের অব্যবস্থাপনায় টিকার সংকট: জিয়াউদ্দিন
আগের সরকারের অব্যবস্থাপনায় টিকার সংকট: জিয়াউদ্দিন
গণভোটের রায় বাস্তবায়নে গড়িমসি, সরকারের সাফল্য ম্লান হতে পারে: সুজন
গণভোটের রায় বাস্তবায়নে গড়িমসি, সরকারের সাফল্য ম্লান হতে পারে: সুজন