• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১
  • live

জুলাইয়ের দুই বছর: যে আগুনে ভেঙেছিল শৃঙ্খল

নিজস্ব প্রতিবেদক    ১ জুলাই ২০২৬, ০৩:০০ এ.এম.
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে আঁকা গ্রাফিতি
ছবি: সংগৃহীত

আজ ১ জুলাই ২০২৬। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি। ২০২৪ সালের এই দিনে কোটা সংস্কার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এ অভ্যুত্থানের সূচনা হয়। অভ্যুত্থানে সারা দেশের নাগরিক শক্তির দুঃসাহসী ঐক্য গড়ে ওঠে, যা শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনকে উৎখাত করে।

সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয় ছাত্রছাত্রীরা। উত্তরোত্তর নিষ্ঠুরতার সঙ্গে সেই আন্দোলন দমনের চেষ্টা করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার। পুলিশ ও দলীয় সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে নিরীহ আন্দোলনকারীদের ওপর সরকার নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ চাপিয়ে দিলে এই দমন–প্রচেষ্টা সীমাহীন নিষ্ঠুরতায় পৌঁছায়। সন্তানদের এই অবাধ হত্যাকাণ্ড কিছুতেই মেনে নেয়নি দেশের মানুষ। মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে দলে দলে রাজপথে নেমে এসে শেখ হাসিনাকে দেশছাড়া করে তারা।

গণ–অভ্যুত্থানের পটভূমি
আওয়ামী লীগের দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনই এই গণ–অভ্যুত্থানের পটভূমি রচনা করেছিল। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের তিনটি নিয়ন্ত্রিত ও একতরফা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা ক্রমশ নিজের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেন। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরে একচেটিয়া কর্তৃত্ব কায়েম করে সব রকমের বিরোধী মত ও কার্যক্রম কার্যত রুদ্ধ করে দেন। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, গায়েবি মামলা ইত্যাদি আইনি–বেআইনি নিষ্পেষণে দেশ ত্রাসের রাজত্বে পরিণত হয়। বিরোধী মতের প্রকাশ হয়ে ওঠে অপরাধ, গণমাধ্যম নজিরবিহীন আক্রমণের শিকার হয়, রাজনৈতিক নিগড়ে বাঁধা পড়ে বিচারব্যবস্থা।

দেশের অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সময়ে–সময়ে নানা রাজনৈতিক কর্মসূচি নিলেও বলপ্রয়োগে ও কূটকৌশলে সরকার তা অকার্যকর করে দেয়। দলটির কর্মীদের ওপর দুর্বিষহ অত্যাচার ও নিপীড়ন চালিয়ে সরকার আন্দোলনগুলো দমন করে। বস্তুত আওয়ামী শাসনের দেড় দশকে তারা অপরিসীম নির্যাতনের শিকার হন। আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কর্মীদেরও একইভাবে দমন করা হয়।

কোটাবিরোধী আন্দোলনের সঞ্চার এই রাজনৈতিক শূন্যতার মধ্যে। এ আন্দোলনের পূর্বসূত্র পাওয়া যাবে স্কুলছাত্রদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভ্যাটবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে। বিপুল জনসমর্থিত এসব আন্দোলন দানা বেঁধেছিল ‘অরাজনৈতিক প্রজন্ম’ বলে চিহ্নিত কিশোর–তরুণ ছাত্রছাত্রীদের নেতৃত্বে। এ আন্দোলনগুলোই শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের মধ্যে প্রতিবাদী চেতনার স্ফুরণ ঘটায়, জুলাই গণ–অভ্যুত্থান যার চূড়ান্ত প্রকাশ। এসব আন্দোলনে বিকাশপ্রবণ নতুন রাজনীতির নানা লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল, পুরোনো আদলের রাজনীতি যাকে আমলে নেয়নি।

২০২৪-এর জুলাই–আগস্টে সরকারের নানা বাধা ও নিপীড়নের মধ্যে ছাত্রনেতারা অভিনব সব কর্মসূচি দিয়ে আন্দোলনকে বাঁচিয়ে রাখে এবং জনতাকে সম্পৃক্ত করে একে গণবিক্ষোভে রূপান্তরিত করে। ১ জুলাই আন্দোলনটির নাম হয় ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’। ‘বৈষম্যবিরোধী’ শব্দটি সরকারের প্রতি বিক্ষুব্ধ নাগরিকমণ্ডলীর চেতনাকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। ১৬ জুলাই রংপুরে পুলিশের গুলিতে ছাত্রনেতা আবু সাঈদ শহীদ হলে রাস্তায় মানুষের ঢল নামতে শুরু করে।

এরপর সরকারের চালিয়ে যাওয়া অকাতর নিধনযজ্ঞ সত্ত্বেও জোয়ারের মতো গণপ্রতিরোধ আর দমানো যায়নি। শেখ হাসিনা নাগরিকদের বিরুদ্ধে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করেন। শেষ সময়ে তিনি সামরিক বাহিনীকেও নিধনযজ্ঞে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশে তাদের অসম্মতি ছিল আন্দোলনে মোড় ফেরানো বিশেষ মুহূর্ত। অবশেষে ৫ আগস্ট ২০২৪, দেশত্যাগ করতে বাধ্য হন শেখ হাসিনা। এরপর ৮ আগস্ট শপথ নেয় নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার।

গণ–অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা
কোনো রাজনৈতিক রূপরেখা বা রাষ্ট্রকল্প সামনে রেখে জুলাই–আগস্টের গণ–অভ্যুত্থান ঘটেনি। ছাত্রদের সঙ্গে লাখো জনতা যোগ দিয়ে আন্দোলনটিকে রাজনৈতিক অভ্যুত্থানে রূপ দেয়। আন্দোলন সুস্পষ্ট রাজনৈতিক আকার পায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবি জানিয়ে এক দফা ঘোষণার পরে। এ সময়ে মত–পথনির্বিশেষে নাগরিকদের উত্থান ঘটে একক রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শাসনক্ষমতা রদবদলের পথ সরকার রুদ্ধ করে দিয়েছিল। সম্মিলিত শক্তিতে, নিজেদের সার্বভৌম সত্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে সরকারের পতন ঘটানো ছাড়া দেশবাসীর তখন অন্য কোনো উপায় ছিল না।

আন্দোলনের মধ্যে কোনো রাষ্ট্রকল্প না থাকলেও গণ–অভ্যুত্থান নিজে আকাশচুম্বী জন–আকাঙ্ক্ষার জন্ম দেয়। এই জন–আকাঙ্ক্ষায় জোয়ার আসে চিহ্নিত করার মতো অন্তত তিনটি ধারায়।

প্রথমত, এ আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন শিক্ষার্থী, শিক্ষক, নারী, শ্রমিক, পেশাজীবী ইত্যাদি নানা স্তর ও বর্গের মানুষ। বাম, ডান, মধ্যপন্থী—নানা পক্ষের রাজনৈতিক দল ও তাদের সমর্থকরা আন্দোলনে যোগ দেন। নারী, শ্রমিক এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা—সমাজে যাঁরা নানাভাবে প্রান্তিক হয়ে থাকেন, তাদের অংশগ্রহণ ছিল অবারিত। নারীরা নানা পর্যায়ে আন্দোলনকে উজ্জীবিত রাখেন। রাজধানীর প্রান্তবর্তী কোনো কোনো অঞ্চলে অকাতরে প্রাণ দিয়ে রাজপথের দখল রাখেন শ্রমিকরা। রাষ্ট্রীয় পরিসরে তারা যে বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার হয়েছেন, আওয়ামী শাসনের সঙ্গে এসবেরও অবসান ঘটবে—এমন একটি সাধারণ প্রত্যাশা তাদের ছিল। অভ্যুত্থানের শেষ দিকে এবং পরের কিছু দিনে সারা দেশের দেয়ালে দেয়ালে আঁকা গ্রাফিতিতে সাধারণ মানুষের বিচিত্র আকাঙ্ক্ষার তীব্র প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়।

দ্বিতীয়ত, যে ছাত্রনেতারা এ আন্দোলনের সূচনা ঘটিয়েছিলেন, তাদের উল্লেখযোগ্য অংশ এসেছিলেন বিভিন্ন পাঠচক্র এবং বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক সংস্কৃতিচর্চা থেকে। তাদের মন গড়ে উঠেছে সাম্প্রতিক সময়ের দেশ–বিদেশের নতুন চিন্তাধারায়। দর্শন, ইতিহাস, সংস্কৃতি ইত্যাদি নিয়ে পাঠ ও তর্ক তাদের নতুন রাজনৈতিক কল্পনাকে উদ্দীপ্ত করেছে। তাদের লেখা, সাক্ষাৎকার, বক্তৃতা বা বিবৃতিতে এর বহিঃপ্রকাশ ঘটে। এই গণ–অভ্যুত্থান তাদের রাষ্ট্রকল্পনা বাস্তবায়নের অভূতপূর্ব সুযোগ এনে দেয়।

তৃতীয়ত, অভ্যুত্থানের পরপর প্রথম কয়েক মাসে দেশে আলোচনা সভার হিড়িক পড়ে। সেসব সভা–সেমিনারে রাষ্ট্র, রাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ে তরুণ, প্রবীণ, আন্দোলনকারী, বিশেষজ্ঞ, পেশাজীবী ও জন–বুদ্ধিজীবীরা ব্যাপকভাবে অংশ নেন। তাদের আলোচনা ও তর্কবিতর্ক গণমাধ্যম হয়ে নাগরিক সমাজকে সম্পৃক্ত করে। সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন করা ঐকমত্য কমিশনে রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে মতবিনিময় করেছে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো।

বিভিন্ন মাধ্যমে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর নিয়ে গণ–আকাঙ্ক্ষা কোনো একটি মাত্রায় প্রকাশিত না হলেও সেগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল অভিন্ন, যা ‘রাষ্ট্র সংস্কার’ নামে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সাধারণভাবে বললে এর বিষয়সূচিতে ছিল নতুন সংবিধান রচনা বা সংবিধানের জনগণতান্ত্রিক সংশোধন, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, নির্বাচনী ব্যবস্থার পুনর্গঠন, নাগরিকদের আত্মমর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত সংস্কার, ধর্মীয় ও জাতিগত সম্প্রীতি, লিঙ্গীয় বিভেদের অবসান ইত্যাদি।

উত্থান–পতনের দুই বছর
গণ–অভ্যুত্থানের পর মানুষের মধ্যে যে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসের জন্ম হয়েছিল এবং অনেকেই যে রাষ্ট্রের আমূল প্রগতিশীল রূপান্তরের স্বপ্ন দেখেছিলেন, পরবর্তী ঘটনাধারায় তা ম্লান হতে শুরু করে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরে দলীয় নকশায় গড়ে তোলা প্রশাসন ও প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। সরকারি প্রণোদনায় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানো পুলিশ বাহিনীও তার নৈতিক মনোবল হারিয়ে ফেলে। এই ভেঙে পড়া প্রশাসনযন্ত্র দিয়ে রাষ্ট্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে।

এই শূন্যতায় অপরাধ, নৈরাজ্য ও হিংসা ব্যাপক সামাজিক বিশৃঙ্খলার জন্ম দেয়। মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে রক্ষণশীল ভাবাদর্শের আধিপত্য স্থাপনের চেষ্টা এবং নীতি–পুলিশগিরি। আক্রান্ত হয় মাজার–খানকা–মণ্ডপ, বাধাগ্রস্ত হয় যাত্রা–নাটক–চলচ্চিত্র প্রদর্শনী। ভাবাদর্শগত চাপ, হুমকি এবং প্রকাশ্য লাঞ্ছনায় আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার নারী, শ্রমিক এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের পরিসর ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসে।

গুচ্ছ গুচ্ছ নাম দিয়ে হত্যা মামলা দায়েরের ঢল নামে। উসকানি ও হানাহানি, যৌক্তিক–অযৌক্তিক দাবিতে রাস্তা দখল ও জোটবদ্ধ হামলা, অকারণ আটক বা গ্রেপ্তার, শেখ হাসিনার উপর্যুপরি প্ররোচনাময় ফোনালাপের সূত্র ধরে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি ধ্বংস, মিয়ানমারে মানবিক করিডর কিংবা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে চট্টগ্রাম বন্দরের তদারকির ভার দেওয়ার বিতর্ক ইত্যাদি একের পর এক উত্তেজনাকর ঘটনা বছরটিকে অস্থির করে রাখে।

এই আবহে জোটবদ্ধ হিংসা বা মব ভায়োলেন্সের মাধ্যমে বিভিন্ন অগণতান্ত্রিক শক্তি প্রতিষ্ঠালাভের চেষ্টা করে। গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর করা, আয়নাঘর উন্মুক্ত করে দেওয়া, গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে চলতে দেওয়া ইত্যাদি প্রশংসনীয় কিছু উদ্যোগ নিলেও অনেক ক্ষেত্রেই বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারেনি তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। বেশকিছু ঘটনায় সক্রিয় পদক্ষেপ না নিয়ে বিবৃতি দিয়ে দায় সারে ড. ইউনূসের সরকার। জনসমাজে তা বিভ্রান্তিকর বার্তা দিয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকার পুরোনো ধারায় আমলাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বহু আলোচিত ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকারের নির্লিপ্ততা, দ্বিধা বা দিকনির্দেশনাহীনতা নাগরিকদের সমালোচনার মুখে পড়ে।

সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ টানাপোড়েনের সূত্রপাত হয় নির্বাচন ও সংস্কারকে ঘিরে। অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের জন্য শিথিল একটি সময় ঘোষণা করেছিল—কম সংস্কার চাইলে ডিসেম্বর ২০২৫–এ, পর্যাপ্ত সংস্কার চাইলে জুন ২০২৬–এ। ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করা ছাত্রদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নির্বাচনের আগে পর্যাপ্ত রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি জানায়। দৃঢ়ভাবে এর বিপরীতে অবস্থান নেয় বিএনপি। তারা দাবি তোলে ন্যূনতম সংস্কার শেষে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচনের। পরস্পরবিরোধী এসব মতামত রাজনৈতিক অচলাবস্থার সৃষ্টি করে। এ অচলাবস্থার চূড়ান্ত অবসান ঘটে ঐ বছরের ১৩ জুন, লন্ডনে বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের একান্ত বৈঠকে। জাতীয় নির্বাচনের নতুন সময়সীমা নির্ধারণ করা হয় ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে।

অবশেষে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যায় সমাপ্ত হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় নিয়ে সরকার গঠন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), প্রধানমন্ত্রী হন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র ও বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এই নির্বাচনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পেয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বিরোধীদল হয় জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট।

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ এর গণ–অভ্যুত্থানের ওপর নিজেদের দখল প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে যে বিরোধ দেখা দেয়, তা নাগরিক ঐক্যে ফাটল ধরিয়েছিল। দ্রুতই তারা বিবাদে লিপ্ত হয়ে পড়ে। বিএনপি, এনসিপি, জামায়াতে ইসলামী এবং বিভিন্ন বাম দল যার যার অবস্থান ধরে রাখে। সফল একটি গণ–অভ্যুত্থানের পর এটিই হয়ে আছে সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। নাগরিক ঐক্যের এই দ্রুত বিভাজন গণ–অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে আকাশ থেকে মাটিতে নামিয়ে আনে।

তবু বাংলাদেশের পক্ষে আর ৫ আগস্টের আগে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। জুলাই গণ–অভ্যুত্থান বাংলাদেশকে তার পুরোনো ইতিহাসের শক্তি মনে করিয়ে দিয়ে গেছে। শাসক যত শক্তিমানই হোক না কেন, দেশের মানুষ অবিভাজ্য রাজনৈতিক সত্তা হয়ে তার মুখোমুখি দাঁড়ালে, নিজেদের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করলে ইতিহাস বদলে দিতে পারে—যেমন ঘটেছিল ১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৭১ ও ১৯৯০ সালে।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থান দেশের মানুষকে জানিয়ে দিয়ে গেছে, এই রাষ্ট্রের তারাই মালিক, তারাই জিম্মাদার। এ বার্তা শুধু মানুষের জন্যই ছিল না, ছিল শাসকদের জন্যও: স্বৈরাচারী শাসকের কর্তৃত্ব যতই কঠিন হোক, নিষ্ঠুরতা যতই সীমাহীন হোক, গণজোয়ারের মুখে তারা খড়কুটোর মতো ভেসে যেতে বাধ্য।

ভিওডি বাংলা/এফএ


মন্তব্য

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
ফাইল ছবি
নতুন ৩ উপজেলা ও ১ থানা গঠনের সিদ্ধান্ত
সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরে আয়োজিত সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাব দেন জাহেদ উর রহমান। ছবি: সংগৃহীত
তথ্য উপদেষ্টা শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচার নিষেধ, গণমাধ্যমকে নির্দেশনা মানতে হবে
ছবি: সংগৃহীত
বাজেট ২০২৬-২৭ কোন মন্ত্রণালয়ে কত বরাদ্দ