• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১
  • live

মাহাথির মোহাম্মদ: উন্নয়নের নতুন ইতিহাস গড়া এক নেতা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক    ১০ জুলাই ২০২৬, ০৫:০৭ পি.এম.
ফাইল ছবি
ফাইল ছবি

মালয়েশিয়ার রাজনীতি, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসে এক অনন্য নাম মাহাথির মোহাম্মদ। চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও দূরদর্শী নেতৃত্ব ও উন্নয়ন ভাবনায় তিনি হয়ে ওঠেন আধুনিক মালয়েশিয়ার অন্যতম প্রধান রূপকার। গত বছর শতবর্ষ পূর্ণ করার পর এবার ১০১ বছরে পদার্পণ করলেন দেশটির সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী।

১০ জুলাই ১৯২৫ সালে মালয়েশিয়ার কেদাহ রাজ্যের আলোর সেটারে জন্মগ্রহণ করেন মাহাথির বিন মোহাম্মদ। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া তিনি ছিলেন বাবা-মায়ের ১০ সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। তাঁর বাবা ছিলেন একজন স্কুলশিক্ষক।

চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়াশোনা শেষ করে ১৯৫৩ সালে সরকারি চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন মাহাথির। ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত সরকারি দায়িত্ব পালনের পর নিজ এলাকায় ব্যক্তিগত ক্লিনিক চালু করেন। সেখান থেকেই তিনি ‘ডা. এম’ নামে পরিচিতি পান। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, চিকিৎসাবিদ্যার অভিজ্ঞতা তাঁকে বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানসিকতা গড়ে দেয়, যা তাঁকে রাজনীতিতে আসতে অনুপ্রাণিত করে।

রাজনীতিতে উত্থান

মাত্র ২১ বছর বয়সে, ১৯৪৬ সালে ইউনাইটেড মালয়াস ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (ইউএমএনও)-তে যোগ দিয়ে মাহাথিরের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়। ১৯৬৪ সালে দলটির মনোনয়নে প্রথমবারের মতো পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হন।

মালয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ায় ১৯৬৯ সালে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং সংসদীয় আসনও হারাতে হয়। তবে রাজনৈতিক অধ্যায়ের ইতি সেখানেই টানেননি তিনি। ১৯৭২ সালে ইউএমএনওতে ফিরে আসেন, ১৯৭৩ সালে দলের সুপ্রিম কাউন্সিলের সদস্য এবং একই বছর সিনেটর হন। ১৯৭৪ সালে আবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পান।

টানা ২২ বছরের নেতৃত্ব

১৯৭৬ সালে উপপ্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ১৯৮১ সালের জুনে ইউএমএনওর সভাপতি নির্বাচিত হন মাহাথির। একই বছরের জুলাইয়ে ৫৬ বছর বয়সে মালয়েশিয়ার চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এরপর টানা ২২ বছর, অর্থাৎ ১৯৮১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত দেশটির নেতৃত্ব দেন। পরে ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় দফায় আরও দুই বছর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। সব মিলিয়ে ২৪ বছর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে তিনি মালয়েশিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের সরকারপ্রধানের রেকর্ড গড়েন।

তাঁর নেতৃত্বে কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে শিল্প ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হয় মালয়েশিয়া। শিল্পায়ন, রপ্তানিমুখী উৎপাদন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন। ইলেকট্রনিকস, স্টিল ও অটোমোবাইল শিল্পে দেশটির উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটে।

মাহাথির আমলে নির্মিত পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার, কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, পুত্রাজায়া প্রশাসনিক নগরী এবং নর্থ-সাউথ এক্সপ্রেসওয়ে আধুনিক মালয়েশিয়ার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৯৯১ সালে ঘোষিত তাঁর ‘ভিশন ২০২০’ কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল মালয়েশিয়াকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করা।

তাঁর শাসনামলে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিস্তার, শিক্ষার হার বৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় এবং মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পায়। এসব অর্জনের কারণে তাঁকে ‘আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।

উন্নয়নের পাশাপাশি বিতর্ক

অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রশংসিত হলেও মাহাথিরের শাসনামল নানা বিতর্কেরও জন্ম দেয়। সমালোচকদের অভিযোগ, তাঁর সরকারের মধ্যে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা ছিল এবং ভিন্নমত দমন, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগও ওঠে।

১৯৮৭ সালের ‘অপারেশন লালাং’ এবং ১৯৮৮ সালের বিচার বিভাগীয় সংকট তাঁর শাসনামলের সবচেয়ে আলোচিত বিতর্কগুলোর মধ্যে অন্যতম।

আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে দ্বন্দ্ব

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম একসময় মাহাথিরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও শিষ্য ছিলেন। ১৯৯৩ সালে তিনি উপপ্রধানমন্ত্রী হন এবং মাহাথিরের সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত হতে থাকেন।

তবে ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে নীতিগত মতপার্থক্যের কারণে দুজনের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ১৯৯৮ সালে মাহাথির আনোয়ারকে উপপ্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে অপসারণ করেন। পরে সমকামিতা ও দুর্নীতির মামলায় আনোয়ার কারাদণ্ড পান। আনোয়ার এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন। অন্যদিকে মাহাথির তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন।

অবসর ও নাটকীয় প্রত্যাবর্তন

২০০৩ সালের অক্টোবরে স্বেচ্ছায় প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়েন মাহাথির। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘একনায়কেরা কি কখনো পদত্যাগ করে? যদি এমন কোনো একনায়ক কেউ দেখাতে পারে, যে নিজে থেকে পদ ছাড়েন, তাহলে তাঁকেও একনায়ক বলা যাবে।’

একই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমার অন্যতম বড় আফসোস, ২০০৩ সালে ৭৮ বছর বয়সে অবসর নেওয়া।’

অবসরের পরও তিনি রাজনীতি থেকে পুরোপুরি সরে যাননি। বিভিন্ন সময়ে সরকারের সমালোচনা, প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় ছিলেন।

৯৪ বছর বয়সে আবার প্রধানমন্ত্রী

সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ১৫ বছর পর সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে আসেন মাহাথির। পুরোনো বিরোধ ভুলে আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে জোট গঠন করেন।

২০১৮ সালের ৯ মে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে ‘পাকাতান হারাপান’ জোট জয়ী হলে ১০ মে ৯৪ বছর বয়সে বিশ্বের সবচেয়ে প্রবীণ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তিনি।

জোটের শর্ত অনুযায়ী দুই বছর পর ক্ষমতা আনোয়ারের হাতে তুলে দেওয়ার কথা থাকলেও নতুন করে মতবিরোধ তৈরি হয়। নির্ধারিত সময়ের দুই মাস আগে, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে মাহাথির পদত্যাগ করলে জোট সরকারের পতন ঘটে। পরে মুহিউদ্দিন ইয়াসিন নতুন সরকার গঠন করেন।

নির্বাচনে পরাজয়

২০২২ সালের নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে মাহাথির নিজের সংসদীয় আসন হারান। তিনি মাত্র ৭ শতাংশ ভোট পান। ১৯৬৯ সালের পর এটিই ছিল তাঁর প্রথম নির্বাচনী পরাজয়।

বয়স ১০১, তবু থামেননি

বিগত কয়েক বছরে একাধিকবার শারীরিক জটিলতায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মাহাথির। ২০০৭ সালে তাঁর বাইপাস সার্জারি হয়, এর আগে ১৯৮৯ সালেও একই ধরনের অস্ত্রোপচার হয়েছিল। ২০২২ সালে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে বাসায় ব্যায়াম করার সময় পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পান এবং নিতম্বের হাড়ে ফ্র্যাকচার হয়। পরে এপ্রিলের মাঝামাঝি এক পডকাস্টে তিনি বলেন, ‘আমি এখন দাঁড়াতে পারি, তবে পা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। মনে হয়, যেন আমার কোনো পা নেই।’

শারীরিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এখনো সক্রিয় রয়েছেন মাহাথির। তাঁর বিশ্বাস, ‘কাজই হলো সবচেয়ে ভালো ওষুধ।’

নিজের শেষ বয়সের লক্ষ্য নিয়েও তিনি স্পষ্ট। তাঁর ভাষায়, ‘মৃত্যুর আগপর্যন্ত, যতটা পারি, আমি মালয়েশিয়ার উন্নয়নে অবদান রাখতে চাই।’

উত্তরাধিকার নিয়ে নিজের অবস্থানও পরিষ্কার করে তিনি বলেছেন, ‘মানুষ আমাকে কীভাবে মনে রাখবে, তা নিয়ে আমার কোনো চিন্তা নেই।’

তবে তাঁর ব্যক্তিগত ভাবনার বাইরে ইতিহাস বলছে, আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার হিসেবে মাহাথির মোহাম্মদের নাম দেশটির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি, সিএনএন, দ্য ডিপ্লোম্যাট, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ও ব্রিটানিকা।


মন্তব্য

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
ছবি: সংগৃহীত
চীনে ভয়াবহ বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৯
ছবি: সংগৃহীত
জন্মশহর মাশহাদে সমাহিত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি
চীনে জুতার কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড
চীনে জুতার কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, নিহত ২৮