{# Dark-theme overrides for the above-the-fold critical surfaces. Inlined so dark users don't flash a light background while the async dark.css is still loading. #}
  • ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১
  • live

ভিওডি বাংলা অনুসন্ধান

কারওয়ানবাজারে ৬০ সেকেন্ডে ৬০ হাজার টাকার ইয়াবা বিক্রি

মান্না আতোয়ার    ১৯ জুলাই ২০২৬, ১০:৪৫ পি.এম.
ভিওডি বাংলা গ্রাফিক্স
ভিওডি বাংলা গ্রাফিক্স

বিকাল ৪টা ১৭ মিনিট ঢাকার কারওয়ানবাজার রেলক্রসিং সড়কের দুপাশ দিয়ে প্রতি দশ মিনিটে গড়ে পার হচ্ছে ২৩৬টি বিভিন্ন ধরনের যানবাহন, চলাচল করছিলেন গড়ে ৯৬ জন পথচারী। সবার চলার গতিতে ভীষণ ব্যস্ততা। কিন্তু কেউ কেউ এই রেললাইনে এসেই হঠাৎ থেমে যাচ্ছিলেন। তারা কারা? কেন থেমে যাচ্ছেন? এরপর কী করছেন? কেন এসেছেন এখানে?

এ দৃশ্য গত ৭ জুলাইয়ের। সেই থেকে ১৯ জুলাই (রবিবার) পর্যন্ত ১৩ দিন অনুসন্ধান করে পাওয়া গেছে, এটি একটি মাদক স্পট। যেখানে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা চলে ইয়াবা ও গাঁজা বিক্রি। এফডিসি রেলক্রসিং থেকে উত্তরমুখী হেঁটে তেজগাঁও রেলক্রসিং পর্যন্ত গড়ে ১৬ থেকে ২২ জনকে একসঙ্গে মাদক বিক্রি করতে দেখা গেছে। প্রতি ৬০ সেকেন্ড বা এক মিনিটে গড়ে ৪০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকার ইয়াবা ও গাঁজা বিক্রি হচ্ছে। স্পটটিতে এই দুই প্রকার মাদক ছাড়া ফেনসিডিল বা অন্য কোনো মাদক বিক্রি করতে দেখা যায়নি।

এ হিসাবে প্রতি ঘণ্টায় ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ২৪ ঘণ্টা বা এক দিনে ৬০ লাখ থেকে ৮৬ লাখ টাকার মাদক বিক্রি হচ্ছে। 

এখানে দুই ধরনের ইয়াবা বিক্রি হয়, একটি ২৫০ টাকা, আরেকটি ৩০০ টাকা। আর গাঁজার পুরিয়া ১০০ টাকা, সাড়ে ১২ গ্রাম ৭৫০ টাকা, ২৫ গ্রাম ১৩০০ টাকা। কেউ পাইকারি, অর্থাৎ ৫০টি ইয়াবা নিলে গড়ে ২০০ টাকা রাখা হয়। 

সরেজমিনে দেখা গেছে, নারী-পুরুষ উভয় ধরনের বিক্রেতা রয়েছে। তাদের মূল ঘাঁটি বা নিয়ন্ত্রণকক্ষও আবিষ্কার করেছে ভিওডি বাংলা, যার ভিডিও ফুটেজ বার্তা কক্ষে সংরক্ষিত রয়েছে। 

দেখা গেছে, বিক্রেতাদের নিয়ন্ত্রণ করা হয় এফডিসি রেলক্রসিং থেকে তেজগাঁওয়ের দিকে রেল লাইন ধরে এক মিনিট হাঁটলে হাতের ডান পাশে দুটি দোকানের পরই সেই নিয়ন্ত্রণ কক্ষ নামক খুপড়ি ঘর, যেখান থেকে রেললাইনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিক্রেতারা মাদক সংগ্রহ করে থাকেন এবং বিক্রি শেষে টাকা জমা দিয়ে থাকেন। সেখানেও মাদক বিক্রি চলে। পাইকারি ক্রেতারা ওই ঘর থেকেই মাদক কিনে থাকেন। যেখানে প্রায়ই জয়নাল সাব্বিরকে দেখা যায় টাকার হিসাব করতে। তবে কেউ মোবাইল হাতে নিলেই তাকে পাকড়াও করা হয়, মোবাইল কেড়ে নেওয়া হয়, পরীক্ষা করা হয় ভিডিও এবং ছবিগুলো। ভিওডি বাংলার অনুসন্ধানী দলের সদস্যরাও এমন ঘটনার মুখোমুখি হন, তবে কৌশলে ফিরে আসেন মোবাইলসহ অক্ষত। 

এই নিয়ন্ত্রক ঘরের পেছনের দিকে একটি পথ রয়েছে, যা দিয়ে কয়েকটি ঘরে প্রবেশ করা যায়। তবে সেখানে অপরিচিত কাউকে যেতে দেওয়া হয়নি। 

একাধিক বিক্রেতা জানিয়েছেন, যদি কখনো ইয়াবা বা গাঁজা হারিয়ে যায়, বা টাকা কমবেশি হয়, তাহলে তাদের ওপর নেমে আসে নির্যাতন। পেছনের ওই ঘরগুলোতেই রয়েছে সেই টর্চার সেল এবং মাদকের মূল ভান্ডার। মাদকগুলো ট্রেনযোগে আসে বলে জানান তারা। 

অনুসন্ধানকালে এক সকালে ওই খুপড়িঘর গিয়ে এক নারীকে কাঁদতে দেখা যায়। তিনি নতুন এসেছেন, হারিয়ে গিয়েছিল তাকে বিক্রি করতে দেওয়া কয়েকটি ইয়াবা। এরপর তাকে প্রাথমিক শাস্তির মুখোমুখি করেছে সাব্বির ও জয়নাল। নারীদের শাস্তি হচ্ছে, রাতভর গণধর্ষণ আর পুরুষদের ভাগ্যে জোটে ওই টর্চার সেল। যদি কেউ এই ঘেরাটোপ থেকে স্বাভাবিক জীবনে যেতে চায়, তাহলে টাকা দিয়ে পোষা কয়েকজন পুলিশ সদস্য ও মাদক অধিদপ্তরের সদস্যদের দিয়ে তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। এসব বিক্রেতারা একটি ইয়াবা বিক্রি করলে ৩০ টাকা এবং এক পুরিয়া গাঁজা বিক্রি করলে ১০-১৫ টাকা পেয়ে থাকেন। 

সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত একদল বিক্রি করে তারা বিশ্রামে যান। এরপর রাত ৮টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত বিক্রি করেন অন্যরা। 

এভাবে রোটেশন পদ্ধতিতে চলছে এই মাদকের ব্যবসা, যার বিরুদ্ধে খোদ প্রধানমন্ত্রী জিহাদ ঘোষণা করেছেন। সরকারের এই জিরো টলারেন্স নীতি যেমন সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্ব প্রাপ্ত পুলিশ, র‌্যাব, ডিবি ও মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যদের জানা আছে, তেমনি যুগ যুগ ধরে কারওয়ান বাজারে মাদকের এই স্পট হরদম চলার বিষয়টি তাদের জানা। 

প্রশ্ন হচ্ছে পুলিশ, মাদক নিয়ন্ত্রণ দপ্তরগুলো জেনেও কেন নির্মূল করছে না? কারা টিকিয়ে রাখছে এই মাদক স্পট? কারা জড়িত এর সঙ্গে যে প্রকাশ্যেই চলে বেচাকেনা? 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আগে আওয়ামী লীগ আমলে দলটির স্থানীয় নেতাকর্মীরা এবং পুলিশ ও কিছু গণমাধ্যমকর্মী নিয়মিত টাকা পেয়ে চুপ ছিলেন। সেসময় জয়নাল এই স্পটটি চালাতো। সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিল শাহীন ও সাব্বির। তারাই নেতাদের এবং পুলিশকে ম্যানেজ করে টিকিয়ে রেখেছিলেন এই অবৈধ মাদক বিক্রির স্পট। 

তাহলে বর্তমানে কারা টিকিয়ে রেখেছেন এই অবৈধ বাণিজ্য? সে বিষয়ে ওই ১৩ দিন ধরে সেখানকার অন্তত ৬০ জনের সঙ্গে কথা বলেছে ভিওডি বাংলা। তারা কেউ মুখ খুলতে চাচ্ছিলেন না। নাম প্রকাশ করা হবে না বলে নিশ্চিত করলে তারা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতার প্রেক্ষাপট বদলে যাওয়ার পর মাত্র তিনদিন বন্ধ ছিল এই স্পট। এরপর জয়নাল-সাব্বির জুলাই আন্দোলনে যুক্ত স্থানীয় নেতাকর্মী এবং অভ্যুত্থান পরবর্তীতে রাজনীতিতে প্রকাশ্যে সরব হওয়া বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের স্থানীয় নেতাকর্মীদের ম্যানেজ করে ধরে রাখে এই স্পট। গত ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে বিএনপি। এরপর ওই স্থানের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারদলের নেতাকর্মীদের ম্যানেজ করে এখনো টিকিয়ে রাখা হয়েছে এই মাদক স্পট। যেখানে এ পর্যন্ত পুলিশ সদস্য ও সাংবাদিকসহ বেশ কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ীদের হাতে ছুরিকাহত হয়েছেন প্রতিবাদ করতে গিয়ে। 

রেললাইন সংলগ্ন একাধিক চা বিক্রেতা জানান, তারা দুই যুগের বেশি সময় ধরে দেখে আসছেন মাদকের কেনাবেচা। মাঝেমধ্যে লোক দেখানো অভিযান চালায় পুলিশ। কয়েকদিন পর দেখি গ্রেপ্তাররা জামিনে ছাড়া পেয়ে ফের মাদক বিক্রি করছে। 

জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এম এ জলিল উজ্জ্বল বলেন, পুলিশ মামলার ধারা ও আলামত এমনভাবে আদালতে উপস্থাপন করে যে, আদালত তাদের মাদকসেবী হিসেবে শনাক্ত করে এবং জামিন দিয়ে দেয়। পুলিশ যদি সঠিক তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে আদালতে গ্রেপ্তার আসামিদের উপস্থাপন করেন, তবে আদালত তাদের অবশ্যই সাজার রায় দিয়ে থাকেন। মূল ঘাপলাটা পুলিশের। কারণ, কজনকে ধরে দুর্বল তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করে থাকে এবং মূল হোতাদের গ্রেপ্তারের বাইরে রাখায় তাদের মাদক ব্যবসা চলমান থাকে।   

যেমন ছিল সেই খুপড়িঘর:

রোববার (১৯ জুলাই) বেলা পৌনে ৩টার দিকে ওই খুপড়ি ঘরে গিয়ে দেখা গেছে, একটি চিকি পাতা। সেখানে এক শিশুকে কোলে নিয়ে মধ্যবয়সী এক নারী। তার কাছে মাদকের ভান্ডার। আশপাশে নারী-পুরুষ মিলে ৬-৭ জন তাকে পাহারা দিচ্ছে। ক্রেতা সেজে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ক্রেতাদের মোবাইলের দিকে নজর রাখছে পেছন থেকে এক যুবক। মোবাইল পকেট থেকে বের করার চেষ্টা করতেই ওই যুবক মোবাইল বের করা যাবে না বলে জানায়। এরপর ওই নারী ও আশপাশের অন্যরা মোবাইল ভেঙে ফেলার হুমকি দেয়। নিয়ন্ত্রক শ্রেণীর আরেকজন একটু উঁচু গলায় বলে ওঠেন, ‘পুলিশ জানাইছে ভিডিও ভাইরাল হলে সব শ্যাষ, কাউরে মোবাইল চালাইতে দিবি না।’ 

সেখানে পাহারাদারদের কেউ রয়েছেন বিশেষ অ্যাপস চালানোর দায়িত্বে, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে অন্যদের বলা কথাবার্তা স্পষ্ট শুনতে থাকেন। কেউ চেক করছেন মোবাইলে সিসিটিভির ফুটেজ, যা মাদক সিন্ডিকেট চারপাশে নির্দিষ্ট দূরত্বে পেতে রেখেছে। যেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের আলাপ বা অভিযান চালানোর চেষ্টাকারীদের ছবি বা দৃশ্য সরাসরি দেখতে পারে। যদিও যে কোনো অভিযানের আগেই জেনে যায় এই চক্র। 

তিন দিকে কাপড় দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে চৌকি। চালা বা ছাদ দেওয়া হয়েছে পলিথিন টানিয়ে। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির খবর পেলেই মূল হোতারা খুপড়ি ঘরের পেছনের পথ দিয়ে পালিয়ে ওইসব ঘরগুলো বা টর্চার সেলের দিকে চলে যায়।  

এই স্পটটি ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও থানার আওতাধীন। ওই থানার  অফিসার ইনচার্জ (ওসি) তেজগাঁও থানার মো. মোবারক হোসেন ভিওডি বাংলাকে রোববার বলেন, ‘তদন্তের জন্য বাইরে আছি। আধা ঘণ্টা পর যোগাযোগ করেন।’ ওই সময় পার হওয়ার পর ওসি আর ফোন ধরেননি। অভিযোগ রয়েছে, কারওয়ানবাজারের মাদক বিক্রির টাকা নিয়মিত থানায় যায়। 

এ বিষয়ে জানতে তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনারকে (ডিসি) একাধিক দিন ফোন করলেও তার সাড়া মিলেনি। তার আওতাধীন এলাকার নাগরিকদের অভিযোগ, ডিসিকে মাদক বা অন্য অপরাধের কথা কী জানাবো, উনি তো ফোনই ধরেন না, শুধু নেতারা ফোন করলে ধরেন।’ 

তবে মুঠোফোনে পাওয়া গেছে অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) মোহাম্মদ আক্কাছ আলীকে। তিনি ভিওডি বাংলাকে বলেন, আমাদের টহলরত পুলিশের টিম আছে। তারা প্রতি নিয়ত টহল দিচ্ছে। 

কিন্তু ভিওডি বাংলার অনুসন্ধান চলাকালে সেখানে পুলিশের টহল দেখা যায়নি জানালে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। 

এদিকে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, ‘পুলিশের সদিচ্ছা নেই। তারা এখানে একটি চৌকি বা অস্থায়ী ক্যাম্প বসালেই তো মাদক ব্যবসা বন্ধ হয়। কিন্তু তা করে না। র‌্যাবও খেয়াল করে না। তারাও সোর্সনির্ভর। সোর্সরা এখান থেকে টাকা পায়, তাই র‌্যাব আসে না। ডিবি মাঝেমধ্যে আসে, তা কি করে তারা তা আল্লাহই ভালো জানেন। যাদের নিয়ে যায়, কদিন পরই তাদের আবার মাদক বিক্রি করতে দেখি।’ 

তল্লাশি চৌকি বসানো যায় কি না- স্থানীয়দের বরাতে এ কথা এডিসিকে জানালে তিনি বলেন, ‘পুলিশের স্থায়ী বা অস্থায়ী চৌকি বসবে কি না  এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার।’

ভিওডি বাংলা/আরআর/এমএস  


মন্তব্য

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
ছবি: সংগৃহীত
ঢামেকে রোগী বাণিজ্য ঠেকাতে তৎপর আনসার
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
দিল্লির ঘুম কাড়ছে ‘চিকেনস নেক’, হঠাৎ শিলিগুড়িতে অমিত শাহ
রাজধানীর জলাবদ্ধতা
রাজধানীর জলাবদ্ধতা দায় কি শুধু সিটি করপোরেশনের, নাকি নগরবাসীরও?