• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১
  • live

ধসে পড়তে পারে রোহিঙ্গা শিবিরের ৮০ ভাগ বসতি

নিজস্ব প্রতিবেদক    ১২ জুলাই ২০২৬, ০৭:০৩ পি.এম.
ছবি: ভিওডি বাংলা
ছবি: ভিওডি বাংলা

বাংলাদেশে বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেলা কক্সবাজারে প্রায় ৬ হাজার একর পাহাড় ও বনভূমি উজাড় করে আশ্রয় দেওয়া হয় মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে। ২০২১ সাল থেকে রোহিঙ্গা শিবিরে ভূমিধসে অন্তত ৪৩ জন নিহত এবং ৯৮ জন আহত হয়েছেন। সবশেষ চলমান ভারী বরষায় এসব রোহিঙ্গা শিবির এখন উচ্চ ভূমিধসের ঝুঁকিতে। 

রোহিঙ্গা কো-অর্ডিনেশন প্ল্যাটফর্মের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৪ থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত টানা বৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ১৫ রোহিঙ্গা নিহত এবং আরও ১৮ জন আহত হয়েছেন। এ সময়ে শিবিরগুলোর ২৬ হাজার ১১৯ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, "পুরো রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ৮০ শতাংশ বসতিই পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ রোহিঙ্গা ক্যাম্প করা হয়েছে পাহাড়ি বনে। ক্যাম্পের ঘরগুলো অস্থায়ী। ঝুঁকি দেখা দিলে, তাদের সরিয়ে আনা হয়। এরপর আবার শুকিয়ে গেলে, তারা ফিরে যায়। নিরাপদ করার একমাত্র উপায় হলো শরণার্থী প্রত্যাবাসন।"

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১১ লাখ ৭০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ১১ লাখ ৪০ হাজার কক্সবাজারের ৩৩টি শিবিরে বসবাস করছেন। প্রায় ২৪ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠা প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার আশ্রয়কেন্দ্রে তারা থাকছেন। সরকারি নীতি অনুযায়ী, শিবিরের সব স্থাপনাই অস্থায়ী রাখতে হয়।

ইউএনএইচসিআরের তথ্য বলছে, ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত শিবিরগুলোতে ভূমিধসে অন্তত ৪৩ জন নিহত এবং ৯৮ জন আহত হয়েছেন। এরমধ্যে ২০২১ সালে ৮ জন নিহত ও ২৩ জন আহত হন। ২০২২ সালে নিহত হন ১ জন, আহত ৫ জন; ২০২৩ সালে ৩ জন নিহত ও ১০ জন আহত; ২০২৪ সালে ১২ জন নিহত ও ২৩ জন আহত; এবং ২০২৫ সালে ২ জন নিহত ও ৯ জন আহত হন। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ১৭ জন নিহত এবং ২৮ জন আহত হয়েছেন।

সাম্প্রতিক বৈরী আবহাওয়ায় শিবিরগুলোর মানবিক পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়েছে। ৪ জুলাই রাত থেকে ৯ জুলাই দুপুর পর্যন্ত ৯৫টি ভূমিধস, ১৫৬টি ঝড় এবং ২১টি বন্যার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এ সময়ে বৈরী আবহাওয়াজনিত ২৮৬টি ঘটনা ঘটেছে।

এসব দুর্যোগে ৪ হাজার ৩০৭ জন সাময়িকভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২ হাজার ৮০৯টি আশ্রয়কেন্দ্র এবং সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে আরও ১৩টি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিদ্যা ইনস্টিটিউটের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামাল হোসাইন বলেন, কক্সবাজার অঞ্চলে নিয়মিত সংঘটিত পাহাড় ধস মূলত কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং এটি চরম অব্যবস্থাপনা এবং প্রাকৃতিক ইকোসিস্টেম ধ্বংস করার একটি সম্মিলিত ফল। 

তিনি বলেন, "অতীতে কক্সবাজারের পাহাড়গুলোতে ঘন প্রাকৃতিক বন ছিল, যা লতা-গুল্ম ও বড় বড় গাছের শিকড়ের মাধ্যমে মাটির গভীরে এক শক্তিশালী 'বন্ডিং' বা বন্ধন তৈরি করে রাখত। এই বনাঞ্চল বৃষ্টির পানির সরাসরি আঘাত থেকে মাটিকে রক্ষা করত। পানিকে ধীরে ধীরে মাটির নিচে চুইয়ে যাওয়ার সুযোগ দিত।" 

"কিন্তু রোহিঙ্গা ক্যাম্প তৈরির জন্য নির্বিচারে বন উজাড় করার ফলে পাহাড়গুলো এখন সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে," বলেন তিনি।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) ২০১৮ সালের 'ইমপ্যাক্টস অব দ্য রোহিঙ্গা রিফিউজি ইনফ্লাক্স অন হোস্ট কমিউনিটিজ' শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, রোহিঙ্গা ঢলের কারণে প্রায় ৪ হাজার ৮১৮ একর সংরক্ষিত বনভূমি ধ্বংস হয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য ৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার। শরণার্থীদের বসতি স্থাপনে বন ও পাহাড়সমৃদ্ধ প্রায় ৬ হাজার একর সরকারি জমি ব্যবহার করা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাপকভাবে পাহাড় কাটার কারণে প্রায় ৫ হাজার একর কৃষিজমি চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।


বিশ্বব্যাংকের ২০২২ সালের একটি পলিসি রিসার্চ ওয়ার্কিং পেপার অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে কক্সবাজারে প্রায় ১২ হাজার ৮০৮ হেক্টর বনভূমি হারিয়ে গেছে, যা জেলার মোট বনভূমির প্রায় ২০ শতাংশ। একই সময়ে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোর ভেতরে বনভূমির পরিমাণ ৫৪ শতাংশ থেকে কমে মাত্র ২ শতাংশে নেমে আসে।

গবেষণায় বলা হয়, আশ্রয়কেন্দ্র ও অবকাঠামো নির্মাণে ব্যাপক বন উজাড় ও পাহাড় কাটার ফলে ঢালের স্থিতিশীলতা দুর্বল হয়েছে, মাটিক্ষয় বেড়েছে এবং বর্ষাকালে ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

এলপিজি বিতরণের কারণে জ্বালানি কাঠের জন্য বনের ওপর চাপ কিছুটা কমলেও শিবিরের বসতি ও অবকাঠামো এখনো পরিবেশের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।

ভিওডি বাংলা/আরআর/এমএস 


মন্তব্য

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
উদ্ধারের আগে সুপ্তধারা ঝর্ণা এলাকায় আটকে পড়া চার শিক্ষার্থী। ছবি: সংগৃহীত
সুপ্তধারা ঝর্ণায় আটকে ছিল ৪ ছাত্র, ৯৯৯ নম্বরে ফোনকলে উদ্ধার
ছবি: সংগৃহীত
ছাত্রকে দিয়ে এসএসসির খাতা মূল্যায়ন, শিক্ষক-ছাত্র গ্রেপ্তার
গুরুতর আহত অবস্থায় চুয়াডাঙ্গা থেকে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে নেওয়া হয় জাহিন শেখকে। ছবি: সংগৃহীত
সাবেক যুবদল নেতাকে কুপিয়ে কব্জি বিচ্ছিন্ন, অবস্থা আশঙ্কাজনক