প্রতিবন্ধীদের সেবায় এক সুতোয় গাঁথা হচ্ছে সব মন্ত্রণালয়: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী

দেশের বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ও প্রতিবন্ধী নাগরিকদের সেবা ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন নিশ্চিতে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে বড় ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত।
তিনি জানান, প্রতিটি প্রতিবন্ধী নাগরিকের জন্য খোলা হবে ‘আলাদা ফাইল’, নিশ্চিত হবে দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন। হুইলচেয়ার নিয়ে সহজে ওঠা যাবে ইভি বাসে। প্রতিবন্ধীবান্ধব হচ্ছে দেশের ৫০০ উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। প্রতিবন্ধী শিশুদের স্কুলে ফেরাতে শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণেরও পরিকল্পনা করেছে সরকার।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে প্রতিবন্ধীদের অধিকার ও সেবা নিশ্চিতকরণ এবং বাস্তবায়ন কমিটির দ্বিতীয় ফলোআপ সভা শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান প্রতিমন্ত্রী।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জানান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এরই মধ্যে ঢাকার কড়াইল বস্তিতে প্রতিবন্ধী শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘শিশুস্বর্গ’ নামক একটি বিশেষ কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জোবায়দা রহমানের এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। এ কর্মসূচির মাধ্যমে কড়াইল বস্তির প্রায় ১ হাজার প্রতিবন্ধী শিশুকে স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হচ্ছে।
চলতি অর্থবছর থেকেই এ কার্যক্রমকে দেশের তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে দেশের ২০ থেকে ২৫টি উপজেলায় ‘শিশুস্বর্গ’ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিবন্ধী শিশুদের আর্লি ডিটেকশন (প্রাথমিক শনাক্তকরণ), রেফারাল ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা যখন মাঠ পর্যায় থেকে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের খুঁজে বের করব, তখন প্রত্যেক প্রতিবন্ধী নাগরিকের জন্য আলাদা ফাইল খোলা হবে। সেখানে তাদের সুনির্দিষ্ট চাহিদাগুলো লিপিবদ্ধ থাকবে, যেন পরবর্তীতে সমাজকল্যাণ ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তাদের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান ও অন্যান্য অধিকার নিশ্চিত করা যায়।
সরকারি স্থাপনা ও গণপরিবহনে যুক্ত হচ্ছে বিশেষ সুবিধা। এখন থেকে সরকারের যেকোনো অবকাঠামো বা ভবন নির্মাণে প্রতিবন্ধীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. মুহিত আরো জানান, নতুন নির্মিতব্য ৫০০টি উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় প্রতিবন্ধীদের যাতায়াতের জন্য র্যাম্প, লিফট এবং অন্তত একটি বিশেষ টয়লেটের ব্যবস্থা থাকতে হবে। কোনো প্রকল্প মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সেটি 'ডিস্যাবিলিটি ইনক্লুসিভ' (প্রতিবন্ধীবান্ধব) কিনা, তা কড়াভাবে যাচাই করা হবে।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশে পরিবেশবান্ধব ও বিদ্যুৎচালিত ইভি বাস চালুর যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, সেখানেও প্রতিবন্ধীদের সুবিধার কথা ভাবা হচ্ছে। ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে চালু হতে যাওয়া ইভি বাসগুলোয় যেন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীরা সহজে উঠতে ও যাতায়াত করতে পারেন, সেই নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী ড. মুহিত জানান, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নতুন উদ্যোগে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের খেলাধুলায় সম্পৃক্ত করতে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এ একটি আলাদা সেগমেন্ট রাখা হচ্ছে। স্পেশাল অলিম্পিক ও প্যারা অলিম্পিকে দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনা সফল প্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদদের এরই মধ্যে ১ লাখ টাকা করে অনুদান ও সংবর্ধনা দেয়া হয়েছে এবং এ ধারা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় বিভিন্ন জেলায় প্রতিবন্ধী শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন ও ফিজিওথেরাপির পাশাপাশি শিক্ষার মূল ধারায় ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে। সাধারণ স্কুলে যাওয়ার আগের প্রস্তুতিমূলক শিক্ষা এবং ইনক্লুসিভ স্কুলের শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণের জন্য একটি সমন্বিত বড় পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে মন্ত্রণালয়।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তিদের বিষয়গুলোকে কেবল 'চাহিদা' হিসেবে দেখছি না, বরং এগুলো তাদের 'অধিকার'। প্রতিটি মন্ত্রণালয় অন্য সাধারণ নাগরিকদের পাশাপাশি প্রতিবন্ধী নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় কাজ করবে, যেন আমরা একটি বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলতে পারি।
সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল জানান, প্রতিবন্ধীদের অধিকার নিশ্চিত করা কোনো দয়া বা চ্যারিটি নয়। একটি রাষ্ট্রের সাথে তার নাগরিকদের যে সামাজিক চুক্তি থাকে, সেই চুক্তি অনুযায়ী একজন নাগরিক হিসেবে এটি তাদের প্রাপ্য অধিকার। আমরা সেই অধিকার নিশ্চিত করার কাজ করছি।
তিনি বলেন আমরা একটি সমন্বিত 'ওয়ানস্টপ সার্ভিস সেন্টার' গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। যেখানে একই কমপ্লেক্সের ভেতরে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং উৎপাদিত পণ্যের বিপণন বা মার্কেটিংয়ের সুবিধা থাকবে।
সভায় স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
ভিওডি বাংলা/আরআই/এফএ








মন্তব্য