• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১
  • live

ফায়ারের গাড়ি চালকের কোটি কোটি টাকা, পেছনে শেখ হাসিনার মুখ্যসচিব

নিজস্ব প্রতিবেদক    ১২ জুলাই ২০২৬, ০৬:২৯ পি.এম.
ফায়ারের গাড়ি চালকের কোটি কোটি টাকা, পেছনে শেখ হাসিনার মুখ্যসচিব
গ্রাফিক্স: ভিওডি বাংলা

এ রূপকথা নয়, বাস্তব। তিনি আর কেউ নন- বরিশাল উজিরপুরের এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর ছেলে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের গাড়িচালক মো. সাখাওয়াত হোসেন। জাল ড্রাইভিং লাইসেন্স ও শিক্ষা সনদে এ দপ্তরে সরকারি চাকরি মিলে তার। এরপর পেছনে তাকাতে হয়নি। চাকরিস্থলে সরকারি গাড়িতে কর্মকর্তাদের বহন করলেও ব্যক্তি জীবনে চলাচল করেন ল্যান্ড ক্রুজার বা প্রাডোর মতো দামি গাড়িতে।

এখন ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে তার কয়েকটি বাড়ি-ফ্ল্যাট, আভিজাত্যের গড়াগড়ি।

রাজধানীর বছিলার অভিজাত গার্ডেন সিটিতে প্রায় ২ কোটি টাকার সাড়ে তিন হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাট, শেওড়াপাড়ায় কোটি টাকার ফ্ল্যাট, গ্রামের বাড়িতে আলিশান ভবন, বাগানবাড়ি, বরিশাল শহরে আছে জমি। এসব সম্পদের কয়েকটি ভিডিও এসেছে ভিওডি বাংলার কাছে। গ্রামের বাড়িতে বানাচ্ছেন কয়েক কোটি টাকার ডুপ্লেক্স ভবন। মোটকথা- কী নেই তার! শুধু নেই জবাবদিহিতা।

তবে ফায়ার সার্ভিসের বর্তমান মহাপরিচালক দুর্নীতি ও নিয়োগ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করায় অপচেষ্টা করেও এ বছর তেমন সুবিধা করতে পারেননি সাখাওয়াত। এমনকি তার বিগত সরকারের আমলের দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ বিভিন্ন অনিয়মের তদন্তে নেমেছে ফায়ার সার্ভিস। এবার তিনি চাকরি হারানোসহ দুর্নীতির মামলায় ফেঁসে যেতে পারেন বলে ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত কমিটির একটি সূত্র ভিওডি বাংলাকে জানিয়েছে।

কমিটিতে থাকা একজন সেনা কর্মকর্তা বলেন, প্রাথমিকভাবে তার একাধিক বাড়ি ও সম্পদের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে বর্তমান ডিজি অত্যন্ত কঠোর। তাই এবার চাকরি হারিয়ে দুর্নীতির মামলার আসামিও হতে পারেন সাখাওয়াত। যদিও ইতোমধ্যেই তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। চলছে তদন্ত।

এদিকে একদিনে নয়- বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে দুহাতে টাকা কামিয়েছেন তিনি। পেছনে উঠে এসেছে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক মুখ্য সচিবের নাম, যার এলাকাতেই বাড়ি চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সরকারি গাড়িচালক সাখাওয়াতের।

সরকারের সেবা সংস্থা ফায়ার সার্ভিসে চাকরি দেয়া ও বদলির দালালি করে এত সম্পদ গড়েছেন এই সামান্য গাড়িচালক। চাকরির শুরু থেকেই অবৈধ উপার্জনে চোখ থাকা সাখাওয়াত ২০০৭ সালে বিভাগীয় তদন্তের মুখে পড়েন। কিন্তু ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য সচিব শেখ হাসিনাঘনিষ্ঠ আবদুস সোবহান শিকদারের শেল্টারে ঘুরে যায় ভাগ্যের চাকা। ভোলা থেকে বড়-বড় ইলিশ মাছ পাঠানো শুরু হয় তার বাসায়। বাড়ে ঘনিষ্ঠতা। সেই সুযোগে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের এই মুখ্য সচিবের প্রভাব কাজে লাগিয়ে ফায়ার সার্ভিসের তৎকালীন কর্তা-ব্যক্তিদের সঙ্গে ওঠা বসা শুরু করেন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সাখাওয়াত। এরপর আর কোনো শাস্তির মুখে পড়তে হয়নি তাকে। এ কারণে সোবহান শিকদারকে ‘ভাগ্য বিধাতা’ মনে করেন তিনি। তার সহকর্মীদের সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

ফায়ার সার্ভিসের তৎকালীন একাধিক মহাপরিচালক এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সাখাওয়াতের এই দুর্নীতিতে জড়িত থাকায় তার বিচার হয়নি, চাকরি যায়নি- বরং ফুলেফেঁপে উঠেছে সম্পদ। যারা এসব সত্য প্রকাশ করতে চেয়েছেন, আলোচনা বা বিতর্ক তুলে প্রতিবাদ করেছেন- তারাই পড়েছেন ওইসব কর্মকর্তাদের রোষানলে, হয়েছেন নানাভাবে নাজেহাল। এতে প্রশ্ন উঠেছে- সংস্থাটির বিগত দিনের কার্যক্রম ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে।

যে সংস্থার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে  থাকেন প্রেষণে নিয়োগ পাওয়া ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তা- সেখানে তার সম্মতি না থাকলে এমন ‘টাকার খনি’ কীভাবে নিজের করে নিলেন এই গাড়িচালক, সে প্রশ্ন অমিমাংসীতই রয়ে যাচ্ছে।

সাখাওয়াত হোসেন জাল ড্রাইভিং লাইসেন্স ও শিক্ষা সনদ জমা দিয়ে চাকরি পান। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় তার বিরুদ্ধে একাধিক বিভাগীয় মামলা হয়। সাময়িক বরখাস্তের নাটকীয়তার আড়ালে তাকে রক্ষা করেন উর্ধ্বতন সেই কর্মকর্তারা, যারা সাখাওয়াতের ক্ষমতার মূল হাতিয়ার।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গ্রামের বাড়ি উজিরপুর উপজেলার ওটরা ইউনিয়নের কেশবকাঠি গ্রামেপ্রায় দুই বিঘা জমির ওপর ডুপ্লেক্স বাগানবাড়ি বানাচ্ছেন সাখাওয়াত হোসেন। নির্মাণাধীন বাড়িটির তৃতীয় তলার কাজ চলছে। স্থানীয়রা বলছেন, এটি বাড়ি নয়, রাজপ্রাসাদ!

গ্রামের লোকজন বলছেন, সাখাওয়াত টাকার বিনিময়ে আত্মীয় স্বজন ও গ্রামের অনেক মানুষকে চাকরি দিয়েছেন। তার হাতে টাকা দিলে চাকরি হতো তাই তারা টাকা দিতেন। এখনো দিচ্ছেন।

বরিশাল শহরের আলেকান্দায় জাকির শরীফ নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে পৌরসভার ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের ৬৭৯৪ নম্বর দাগে জমি কিনেছেন ২০০৭ সালে, যার বাজারমূল্য এখন কোটি টাকা। বরিশাল শহরের চৌমাথায়ও তার একাধিক প্লট রয়েছে। এসব জমি কিনতে বরিশাল ডিসি অফিসের পিয়ন জুয়েল তাকে সহায়তা করেন।

ঢাকার মোহাম্মদপুরের বছিলা গার্ডেন সিটিতে ‘গার্ডেন রাজধানী বিল্ডার্স’ নামে একটি ভবনে ৩৫০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন তিনি, যার মূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা। শেওড়াপাড়ায় ১৪৫০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট রয়েছে, মূল্য এক কোটি টাকার বেশি। ডেমরা কোনাবাড়িতে ‘মিনি কক্সবাজার’ এলাকার একটি ডেভেলপার প্রজেক্টে তার চারটি শেয়ার ছিল। তার সম্পদ নিয়ে অনুসন্ধান চলছে জানতে পেরে সম্প্রতি ৪০ লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন দুটি শেয়ার। এখন দুটি শেয়ার রয়েছে তার।

এসব সম্পদ তার নিজ নামে রয়েছে। তবে বেনামেও কয়েকশ’ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে বলে আলোচনা আছে তার নিজ গ্রামেও।

অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের শেষদিকে ফায়ার সার্ভিসের তৎকালীন এক মহাপরিচালককে (ডিজি) কাজে লাগিয়ে নিয়োগ ও বদলির ওপেন সিক্রেট বাণিজ্য শুরু করেন সাখাওয়াত। ওই ডিজির দুই বছরের মেয়াদে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন।

প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য সচিব আবদুস সোবহান শিকদারের বাড়ি উজিরপুর হওয়ায় তার ক্ষমতার অপব্যবহার সবচেয়ে বেশি করেছেন সাখাওয়াত। এভাবে বড় কর্মকর্তাদের সান্নিধ্যকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তিনি ফায়ার সার্ভিসে নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য গড়ে তোলেন।

ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স জমা দিয়ে চাকরিতে প্রবেশ করার জালিয়াতি প্রমাণ হওয়ায় তার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী আইনে ২০০৭ সালে বিভাগীয় মামলা হয়। এক বছরের বেতন কর্তন এবং তিরস্কারের দণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু পেছনে সোবহান শিকদার থাকায় কিছুই হয়নি পরবর্তীতে।

সার্বিক বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামালের ভাষ্য, সাখাওয়াতের বিরুদ্ধে ওঠা নিয়োগ বাণিজ্য এবং শৃঙ্খলাভঙ্গসহ বিভিন্ন অভিযোগ তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এরই মধ্যে তাকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে।

এদিকে এসব বিষয়ে সাখাওয়াতের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তিনি গণমাধ্যম কর্মীদের এড়িয়ে চলছেন।

জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী সাখাওয়াতের বাড়ি উজিরপুর উপজেলার মশাংয়। বাবা মৃত আনছার আলী মল্লিক ক্ষুদ্র ব্যবসা করে সংসার চালাতেন টেনেটুনে।

ভিওডি বাংলা/এফএ


মন্তব্য

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
বিএনপির লোগো
স্থানীয় নির্বাচন দলীয় ঐক্য ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ে বিএনপির কঠিন পরীক্ষা
ছবি: সংগৃহীত
তিস্তাপাড়ে আনন্দের জোয়ার, প্রশংসায় ভাসছেন প্রধানমন্ত্রী
প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব
মন্ত্রীদের ১০০ দিন সড়ক, সেতু ও রেলপথে গতি ফেরানোর অভিযাত্রায় প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ