স্থানীয় নির্বাচন
দলীয় ঐক্য ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ে বিএনপির কঠিন পরীক্ষা

জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হলেও দেশের রাজনীতিতে নির্বাচনী হিসাব-নিকাশ থেমে নেই। এবার রাজনৈতিক দলগুলোর নজর আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে। নির্বাচন কমিশন প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি মাঠে সক্রিয় হয়ে উঠছে দলগুলোও। এই বাস্তবতায় বিএনপির ভেতরে শুরু হয়েছে ব্যাপক সাংগঠনিক তৎপরতা, সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই এবং নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণের আলোচনা। তবে নির্বাচনকে ঘিরে দলটির সামনে শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী মোকাবিলাই নয়, দলীয় ঐক্য অটুট রাখা, যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন এবং বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জও রয়েছে।
বিএনপির একাধিক নেতার ভাষায়, সরকার গঠনের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনই হবে দলের সাংগঠনিক সক্ষমতা ও জনসমর্থনের প্রথম বড় পরীক্ষা—এক ধরনের ‘অ্যাসিড টেস্ট’।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দলীয় ঐক্য অটুট রাখা এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নিয়ন্ত্রণে রাখা। একই সঙ্গে মনোনয়নকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য বিদ্রোহী প্রার্থীদের সামাল দেওয়া, তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অসন্তোষ কমিয়ে আনা এবং জনগ্রহণযোগ্য ও বিজয়ী হওয়ার সক্ষমতা রয়েছে—এমন প্রার্থী নির্বাচনও দলটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা, সারাদেশে বিস্তৃত সাংগঠনিক কাঠামো এবং মাঠপর্যায়ে সক্রিয় নেতাকর্মীদের উপস্থিতি বিএনপির জন্য ইতিবাচক দিক হিসেবে কাজ করতে পারে।
দলীয় সূত্র, বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য এবং মাঠপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিএনপি এখন চারটি বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে—দলীয় ঐক্য বজায় রাখা, গ্রহণযোগ্য প্রার্থী নির্বাচন, বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ন্ত্রণ এবং তৃণমূলে সাংগঠনিক সক্রিয়তা বাড়ানো। একই সঙ্গে প্রতীকবিহীন নির্বাচনের সম্ভাব্য বাস্তবতাও দলের কৌশলে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
প্রতীকবিহীন নির্বাচন: নতুন বাস্তবতা
স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীক ছাড়া হলে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যেতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। এ ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং দীর্ঘদিনের জনসম্পৃক্ততা আরও বেশি গুরুত্ব পাবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রতীক ছাড়া হবে। যখন নির্বাচন হবে, তখন আমরা এ বিষয়ে আলোচনা করব।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রতীক না থাকলে জনপ্রিয় স্থানীয় নেতাদের সুযোগ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে একই রাজনৈতিক ধারার একাধিক প্রার্থী মাঠে নামলে ভোট বিভক্তির ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। ফলে সাংগঠনিক সমন্বয়ই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।
কেন ‘অ্যাসিড টেস্ট’?
জাতীয় নির্বাচনে দলীয় নেতৃত্ব, জাতীয় ইস্যু ও সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ প্রভাব ফেলে। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোটাররা প্রার্থীর ব্যক্তিগত পরিচিতি, এলাকার সঙ্গে সম্পৃক্ততা, উন্নয়নমূলক কাজ এবং জনসেবাকে বেশি গুরুত্ব দেন।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু ভিওডি বাংলাকে বলেন, দলীয়ভাবে নির্বাচন হবে না। তাই নির্বাচনের জন্য অনেকে প্রস্তুতি নিতে পারে, তাদের আশা থাকতে পারে। বিশেষ করে নির্বাচন যখন আসে তখন বড় দলগুলোর প্রার্থীর অভাব হয় না। একাধিক প্রার্থী থাকলেও সমস্যা হবে না, প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়বে। অনেকে নির্বাচন করার মাধ্যমে তার পরিচিত বাড়াতে চায়। কারও কারও দৃষ্টিতে কোন্দল, কারও কারও দৃষ্টিতে প্রতিযোগিতা। এতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।
বিএনপির একজন দায়িত্বশীল নেতা বলেন, সরকার গঠনের পর জনগণ সরকারের কর্মকাণ্ডকে কীভাবে মূল্যায়ন করছে, তৃণমূলে সংগঠন কতটা কার্যকর রয়েছে এবং স্থানীয় নেতৃত্ব কতটা গ্রহণযোগ্য—এসব প্রশ্নের বাস্তব উত্তর মিলবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ফলাফলে।
এক পদে এক প্রার্থী—ভোট বিভক্তি এড়ানোর চেষ্টা
অতীতের অভিজ্ঞতায় একই পদে একাধিক নেতার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অনেক এলাকায় ভোট বিভক্তি হয়েছে। দলীয় সূত্র বলছে, এবার সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে জেলা, মহানগর, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায় থেকে মতামত নিয়ে সাংগঠনিক প্রতিবেদন, জনসমর্থন, গ্রহণযোগ্যতা এবং নির্বাচনে জয়ের সক্ষমতা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চিন্তাভাবনা রয়েছে।
একজন জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা গুরুত্বপূর্ণ। তাই শেষ পর্যন্ত জয়ের সম্ভাবনাই হবে প্রধান বিবেচ্য বিষয়।
বিদ্রোহী প্রার্থী ও অভ্যন্তরীণ সমন্বয়
দলীয় পর্যায়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি বিষয় বিদ্রোহী প্রার্থিতা। মনোনয়ন বা সমর্থন না পেলে কেউ স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নিলে ভোট বিভক্তির আশঙ্কা থাকে। এজন্য সম্ভাব্য প্রার্থীদের সঙ্গে আগাম আলোচনা, স্থানীয় পর্যায়ে সমঝোতা এবং সাংগঠনিক সমন্বয়ের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
এছাড়া জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে বিভিন্ন এলাকায় তৈরি হওয়া গ্রুপিং ও অভ্যন্তরীণ বিরোধও স্থানীয় নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা চলছে।
মাঠে সরব সম্ভাব্য প্রার্থীরা
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির সমর্থিত সম্ভাব্য প্রার্থীরা ইতোমধ্যে নিজ নিজ এলাকায় রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছেন। দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময়, বিভিন্ন সামাজিক ও সাংগঠনিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে তারা নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি দলের সমর্থনকে সামনে রেখে তৃণমূলের সমর্থন নিশ্চিত করতে অনেকেই নীরবে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
রৌমারী উপজেলার ২ নম্বর শৌলমারী ইউনিয়নের সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী, ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও উপজেলা যুবদলের নেতা মো. ওমর ফারুক ভিওডি বাংলাকে বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তারা পুরোপুরি প্রস্তুতি নিয়েছেন। বিভিন্ন গ্রাম ও প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রচার-প্রচারণা চালানোর পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন। এছাড়া নিজ উদ্যোগে বিভিন্ন গ্রামের উন্নয়ন ও সংস্কারমূলক কাজও করে যাচ্ছেন।
তিনি বলেন, “আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দল যদি আমাকে সমর্থন দেয়, তাহলে বিপুল ভোটে বিজয়ী হতে পারব বলে আমি আশাবাদী। জনসমর্থনের ভিত্তিতে যদি দল প্রার্থী নির্বাচন করে, তাহলে আমাকে সমর্থন দেবে বলেই আমার বিশ্বাস।”
তিনি বলেন, “আমি নিজের জন্য নির্বাচন করছি না। আমি জনগণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তাদের প্রাপ্য সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই নির্বাচনে অংশ নিতে চাই। বিশেষ করে গরিব, অসহায় ও দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সেবা করার উদ্দেশ্যেই আমি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হয়েছি।”
রৌমারী উপজেলার ৩ নম্বর বন্দবেড় ইউনিয়নের সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী, সাবেক ছাত্রনেতা ও বর্তমান রৌমারী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক নুর আলম খান হিরো ভিওডি বাংলাকে বলেন, জাতীয় নির্বাচনের পর থেকেই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রতিটি গ্রাম ও ওয়ার্ডে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি দাবি করেন, সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া ও জনসমর্থন পাচ্ছেন। বিএনপি যদি তাকে দলীয় সমর্থন বা মনোনয়ন দেয়, তাহলে নির্বাচনে বিজয়ী হতে পারবেন বলে তিনি আশাবাদী।
তিনি বলেন, “জনসমর্থনের ভিত্তিতে যদি বিএনপি সমর্থন করে, তাহলে আমাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। এছাড়া ২০২০ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আমি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছি। সে সময় দলীয় প্রার্থী সংকটের কারণে আমি নির্বাচন করেছি। সেই বিষয়টিও দল বিবেচনায় নেবে বলে আশা করি।”
তিনি বলেন , দীর্ঘদিন ধরে এলাকার রাস্তাঘাটের উন্নয়নসহ বিভিন্ন সামাজিক ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে নিজেকে জনসম্পৃক্ত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ইতোমধ্যে তিনি নিজস্ব অর্থায়নে কয়েকটি সড়কের উন্নয়নকাজও করেছেন।
নুর আলম খান হিরো বলেন, “জনগণ যদি আমাকে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত করেন, তাহলে এলাকার সার্বিক উন্নয়নে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাব।”
জেলা নেতৃত্ব কী বলছে?
কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলহাজ্ব সোহেল হোসাইন কায়কোবাদ ভিওডি বাংলাকে বলেছেন, স্থানীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের স্থানীয় নেতারা আগে থেকেই নিজ নিজ এলাকায় কাজ করছেন। তবে এ বিষয়ে এখনো দল থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি।
তিনি বলেন, নির্বাচন দুই-তিন মাস পর হলেও বিএনপির জয়ের সম্ভাবনা ভালো। সদর উপজেলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আগে তাদের দীর্ঘ সময় ধরে ভালো অবস্থান ছিল ছয়টি ইউনিয়নে বিএনপির চেয়ারম্যান ছিলেন। তৃণমূল পর্যায়েও দলের অবস্থা ভালো রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তিনি জানান, নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে এবং ভালো ফলের আশাবাদী তারা।
প্রার্থী নির্বাচনের বিষয়ে সোহেল হোসাইন কায়কোবাদ বলেন, এখনো কোনো প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়নি। স্থানীয়ভাবে সবাই কাজ করছেন। স্থানীয় নেতারা আগে নিজেদের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেবেন, এরপর পরবর্তী পর্যায়ে দলীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুধু জনপ্রতিনিধি বাছাইয়ের ভোট নয়; এটি হবে রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক সক্ষমতা, স্থানীয় নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা এবং জনগণের প্রত্যাশার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিমাপক। বিএনপির জন্যও সেই পরীক্ষার প্রস্তুতি এখন ধীরে ধীরে তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে।
ভিওডি বাংলা/এএইচ/এমএস/এফএ








মন্তব্য