বিশ্বের বাজেট যুদ্ধ: কোথায় খরচ বাড়াচ্ছে কোন দেশ?

প্রতি বছর জাতীয় বাজেট ঘোষণা করে বিশ্বের প্রায় সব দেশ। সাধারণভাবে এটি সরকারের আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনা হলেও অর্থনীতিবিদদের কাছে বাজেট একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার, উন্নয়ন কৌশল ও অর্থনৈতিক দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিপত্র।
কোন দেশ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে বেশি ব্যয় করছে, কে প্রতিরক্ষায় বাজি ধরছে, আবার কোথায় অবকাঠামো ও প্রযুক্তিতে বিপুল বিনিয়োগ হচ্ছে তার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায় জাতীয় বাজেটে।
বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোর বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাজেটের আকারে যেমন বিস্তর পার্থক্য রয়েছে, তেমনি ব্যয়ের ধরণেও রয়েছে বড় বৈচিত্র্য। কোথাও সামাজিক নিরাপত্তা অগ্রাধিকার পাচ্ছে, কোথাও প্রতিরক্ষা, আবার কোথাও প্রযুক্তি ও শিল্পায়ন।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাজেট যুক্তরাষ্ট্রের
বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জাতীয় বাজেট পরিচালনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে দেশটির ফেডারেল সরকারের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭ ট্রিলিয়ন ডলারে।
বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৮৫০ লাখ কোটি টাকারও বেশি। বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটের তুলনায় এটি কয়েক ডজন গুণ বড়।
অনেকের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের বাজেটের বড় অংশই সামরিক খাতে যায়। তবে বাস্তবে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে। অবসরপ্রাপ্ত নাগরিক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও বিভিন্ন সুবিধাভোগীদের জন্য বিপুল অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়।
এরপর সবচেয়ে বড় ব্যয় খাত স্বাস্থ্যসেবা। মেডিকেয়ার ও মেডিকেইড কর্মসূচির মাধ্যমে প্রবীণ ও নিম্নআয়ের মানুষের চিকিৎসা ব্যয় বহন করে সরকার।
তবে সামরিক ব্যয়ের ক্ষেত্রে এখনো বিশ্বে শীর্ষে যুক্তরাষ্ট্র। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এসআইপিআরআই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যয় ছিল প্রায় ৯২১ বিলিয়ন ডলার, যা বৈশ্বিক সামরিক ব্যয়ের প্রায় ৩৭ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়াজুড়ে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখা এবং আধুনিক অস্ত্র প্রযুক্তি উন্নয়নের কারণেই যুক্তরাষ্ট্রকে এত বড় প্রতিরক্ষা বাজেট বহন করতে হয়।
অবকাঠামো ও প্রযুক্তিতে চীনের জোর
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীনের সরকারি ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চীনের সরকারি ব্যয় প্রায় ২৮ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ইউয়ান বা প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
চীনের ব্যয়ের বড় অংশ যাচ্ছে অবকাঠামো নির্মাণ, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য তৈরিতে।
উচ্চগতির রেলপথ, সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর, বিদ্যুৎ অবকাঠামো, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে চীনের সরকারি বিনিয়োগ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ।
এছাড়া দ্রুত বার্ধক্যের দিকে যাওয়া জনসংখ্যার কারণে সামাজিক নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান খাতেও ব্যয় বাড়াচ্ছে দেশটি।
প্রতিরক্ষা ব্যয়েও চীন এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। এসআইপিআরআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটির সামরিক ব্যয় ছিল প্রায় ২৫১ বিলিয়ন ডলার।
জাপানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বার্ধক্য
বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি জাপান বর্তমানে সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে বৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর কারণে।
দেশটির প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষের বয়স ৬৫ বছরের বেশি। ফলে স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে সরকারকে।
জাপানের বাজেটের সবচেয়ে বড় অংশই যায় সামাজিক নিরাপত্তা খাতে। পাশাপাশি চীন ও উত্তর কোরিয়াকে ঘিরে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে দেশটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতিরক্ষা ব্যয়ও বাড়িয়েছে।
ইউরোপে সামাজিক নিরাপত্তায় বড় ব্যয়
জার্মানি
ইউক্রেন যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকটের পর জার্মানি তাদের বাজেট নীতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। ২০২৬ সালের প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী দেশটির সরকারি ব্যয় প্রায় ৫২০ বিলিয়ন ইউরো।
বর্তমানে দেশটি রেলপথ, সড়ক, ডিজিটাল অবকাঠামো, গ্রিন এনার্জি ও প্রতিরক্ষা খাতে বড় বিনিয়োগ করছে।
যুক্তরাজ্য
যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বড় ব্যয় খাত হলো জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা (এনএইচএস)। এছাড়া শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা, স্থানীয় সরকার ও প্রতিরক্ষা খাতেও বড় বরাদ্দ থাকে।
ফ্রান্স
সরকারি ব্যয়ের দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি ফ্রান্স। আইএমএফ ও ওইসিডির তথ্য অনুযায়ী, দেশটির সরকারি ব্যয় জিডিপির প্রায় ৫৫ শতাংশ।
অর্থাৎ উৎপাদিত প্রতি ১০০ ইউরোর মধ্যে প্রায় ৫৫ ইউরো সরকারি ব্যয়ের আওতায় আসে।
অবকাঠামো নির্মাণে ভারতের বড় বাজি
বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অবকাঠামো উন্নয়নকে বাজেটের কেন্দ্রবিন্দুতে এনেছে।
রেলপথ, এক্সপ্রেসওয়ে, বন্দর, বিমানবন্দর, ডিজিটাল অবকাঠামো ও উৎপাদনশীল শিল্পে বিপুল সরকারি বিনিয়োগ করছে দেশটি।
একইসঙ্গে কৃষি ভর্তুকি, খাদ্য নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা ও প্রতিরক্ষা খাতেও বড় ব্যয় রয়েছে ভারতের।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সেনাবাহিনী পরিচালনার কারণে দেশটি বর্তমানে শীর্ষ সামরিক ব্যয়কারী রাষ্ট্রগুলোর একটি।
মধ্যপ্রাচ্যে তেলের অর্থ এখন প্রযুক্তিতে
সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত দীর্ঘদিন ধরে তেল ও গ্যাস আয়ের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতি পরিচালনা করলেও এখন তারা অর্থনীতিকে বহুমুখী করার পথে হাঁটছে।
পর্যটন, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও নতুন শিল্প খাতে বিপুল বিনিয়োগ বাড়ানো হয়েছে।
বিশেষ করে সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’ কর্মসূচির আওতায় নিওমসহ একাধিক মেগা প্রকল্পে শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
জিডিপির তুলনায় সবচেয়ে বেশি ব্যয় করে কারা?
অর্থনীতিবিদরা সরকারি ব্যয় মূল্যায়নে ‘সরকারি ব্যয়-জিডিপি অনুপাত’কে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচনা করেন।
ইতালি
দেশটির সরকারি ব্যয় জিডিপির প্রায় ৫০ শতাংশের কাছাকাছি। প্রবীণ জনগোষ্ঠী বেশি হওয়ায় পেনশন ও ঋণের সুদ পরিশোধে বিপুল ব্যয় হয়।
বেলজিয়াম
সামাজিক নিরাপত্তা ও জনসেবামূলক ব্যয়ের কারণে বেলজিয়ামও উচ্চ ব্যয়কারী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র
জিডিপির তুলনায় সরকারি ব্যয় ৩৫ থেকে ৩৮ শতাংশ হলেও অর্থনীতির বিশাল আকারের কারণে যুক্তরাষ্ট্রই বিশ্বের সবচেয়ে বড় ব্যয়কারী সরকার।
ছোট দেশ, কিন্তু সরকারি ব্যয় বিশাল
ফিনল্যান্ড
সরকারি ব্যয় জিডিপির ৫৫ শতাংশের বেশি। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তায় বড় সরকারি সহায়তা দেওয়া হয়।
ডেনমার্ক
উচ্চ করের বিনিময়ে নাগরিকদের বিস্তৃত সামাজিক সুবিধা দেয় দেশটি। সরকারি ব্যয় জিডিপির ৫০ শতাংশেরও বেশি।
নরওয়ে
তেল ও গ্যাস আয়ের কারণে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে নরওয়ে।
সুইডেন
স্বাস্থ্যসেবা, পরিবারকল্যাণ ও শিশু পরিচর্যায় বড় সরকারি ব্যয়ের কারণে দেশটি উন্নত কল্যাণ রাষ্ট্রগুলোর অন্যতম।
আইসল্যান্ড ও লুক্সেমবার্গ
জনসংখ্যা কম হলেও মাথাপিছু সরকারি ব্যয়ের দিক থেকে শীর্ষ পর্যায়ে রয়েছে দেশ দুটি।
কারা চালায় উদ্বৃত্ত বাজেট?
বর্তমানে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশই ঘাটতি বাজেটে পরিচালিত হয়। তবে কিছু দেশ এখনো উদ্বৃত্ত বাজেট ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
সিঙ্গাপুর
ভারসাম্যপূর্ণ বাজেট পরিচালনায় সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অনুসরণ করে দেশটি। রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ও সরকারি অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে।
সুইজারল্যান্ড
কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলা ও ‘ডেবট ব্রেক’ নীতির কারণে বড় ঘাটতিতে পড়ে না দেশটি।
কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত
তেলের আন্তর্জাতিক মূল্য অনুকূলে থাকলে দেশ দুটি নিয়মিত উদ্বৃত্ত বাজেট অর্জন করে।
ঘাটতি বাজেটের চাপ যাদের ওপর বেশি
বিশ্বের সর্বোচ্চ সরকারি ঋণ-জিডিপি অনুপাতের দেশ জাপান দীর্ঘদিন ধরেই ঘাটতি বাজেট পরিচালনা করছে।
উচ্চ সামাজিক ব্যয়, ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও ঋণের চাপ দেশটিকে স্থায়ী আর্থিক চাপে রেখেছে।
বাজেটই বলে দেয় ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা
বিশ্বের বাজেট বিশ্লেষণে একটি বিষয় পরিষ্কার- বড় বাজেট মানেই শুধু বড় অর্থনীতি নয়, বরং বড় দায়িত্বও।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বৈশ্বিক নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় বিপুল ব্যয় করছে। ইউরোপের দেশগুলো সামাজিক নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। জাপান বার্ধক্যের ব্যয় সামাল দিচ্ছে। ভারত অবকাঠামো উন্নয়নে বড় বিনিয়োগ করছে। আর নরওয়ে ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো আর্থিক শৃঙ্খলার মাধ্যমে উদ্বৃত্ত বাজেট ধরে রাখছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জাতীয় বাজেট আসলে শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি একটি দেশের বর্তমান বাস্তবতা, রাজনৈতিক দর্শন এবং ভবিষ্যৎ স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি।
ভিওডি বাংলা/আরআই/এমএস








মন্তব্য