‘মাদকসেবিদের’ আমেরিকার গল্প শোনাচ্ছে ডিবি

২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ডিসি মাসুদের মাদকবিরোধী অভিযানের কয়েকটি ভিডিও ভাইরাল হয়। নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের কিছু ঘটনায় নিরীহ শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, দর্শনার্থী বা পথচারীরা যেমন অনাকাঙ্ক্ষিত পুলিশি পিটুনির মুখে পড়েন, তেমনি পাকড়াও হয় মাদক সেবনের জন্য আগতরাও। বেশ আলোচনার জন্ম দেয় ওই ঘটনা। এরপর কেটেছে দুই মাস। এখন কী অবস্থায় আছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান? মাদক বিক্রি কি বন্ধ? মাদক সরবরাহের মূলে যারা—তারা কি ধরা পড়েছে, শনাক্ত হয়েছে?
ভিওডি বাংলা এ ঘটনায় নজর রাখে প্রথম থেকেই। সোমবার (৪ মে) রাত ১০টার দিকে টিএসসির বিপরীতে উদ্যানের নির্মাণকাজে দীর্ঘদিন বন্ধ গেট বরাবর ভেতরে হাতের বামে পাকা ছাদওয়ালা গোলাকৃতির বসার স্থানটি মাদক বিক্রির মূল ঘাঁটি ধরে সেখানে নিজস্ব পদ্ধতিতে সাদা পোশাকে ‘কাউন্সেলিং’ করতে দেখা গেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ—ডিএমপি’র গোয়েন্দা (ডিবি) শাখার কয়েকজন সদস্যকে। আরও দাঁড়িয়ে ছিলেন বিভিন্ন বয়সী অন্তত চারজন ব্যক্তি—যাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছিল। পাশে বসার স্থানে সাজানো মাদক বিক্রির স্পট। কয়েকজন বয়স্ক, আধাবয়স্ক, তরুণীসহ ছিন্নমূল গোছের মানুষ দিয়ে বিক্রির স্পটটি হুবহু ওই স্থানে মাদক বিক্রির মতো করেই সাজানো হয়েছে। কেউ এসে দাঁড়ালে বা হাঁটাহাঁটি করলে ওই নারীরা নিজেরাই এমন শব্দ করেন বা নিজেদের মধ্যে কথোপকথন চালান যেন সত্যিই তারা মাদক বিক্রেতা এবং তাদের কাছে প্রস্তাব দেওয়া যেতেই পারে মাদক কেনার। যা এই উদ্যানে সচরাচর ঘটে থাকে। কত টাকার, কয়টা—ইত্যাদি আওয়াজে প্রকৃত মাদক ক্রেতাকে ফাঁদে ফেলতে এই কৌশল, এই সাজানো মাদক বিক্রিচক্র।
দেখা গেছে, স্থানটিতে এসে যারা এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন—মনে হচ্ছে কী যেন খুঁজছেন বা সাজানো নারী বিক্রেতাদের ফাঁদে পড়ছেন—তাদের ডেকে নেওয়া হচ্ছে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন ডিবি কর্মকর্তার কাছে। সঙ্গে দু-তিনজন কনস্টেবল। ফর্সা, গোলগাল চেহারার দাঁড়িওয়ালা এক যুবককে সেখানে দাঁড়ানো অবস্থায় পাওয়া গেছে—যার কাছে মাদক পাওয়া যায়নি। কিন্তু তিনি ওই স্থানে এসে সাজানো ফাঁদে ধরা পড়েছেন—অর্থাৎ ওই নারীদের কাছে মাদক খুঁজছিলেন। যুবক বলছেন, সরি স্যার। আর পুলিশ কর্মকর্তা ঠান্ডা গলায় ভারী স্বরে বলছেন—মাদক না পেলেও ডিবি অফিসে ধরে নিয়ে যাওয়া যায়। কারণ মাদক কেনার অপরাধপ্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। ডিবি কর্মকর্তা বলেন, আমেরিকায় এটা হয় জানেন? যুবক বলেন, কি হয়। এবার ২০১২ সালে আমেরিকায় কাজী নাফিস ইসলাম নামে এক বাংলাদেশি যুবককে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে বোমা হামলার পরিকল্পনার অভিযোগে এফবিআই স্টিং অপারেশনের মাধ্যমে গ্রেপ্তারের সেই গল্প শুরু করেন ডিবি কর্মকর্তা। বলেন, জানেন? বিশ্বব্যাংকে বোমা মারবে কিনা তা বুঝতে ওই যুবককে একটি সাজানো বোমা দেওয়া হয়েছিল, ওই যুবক যখন বোমা ভেবে সেটি বিশ্বব্যাংকে ছুঁড়লো তখনই তাকে গ্রেপ্তার করা হলো। কিন্তু সেটা বোমা ছিল না, ছিল সাজানো একটি কাগজের পোটলা। তাই বিস্ফোরণ ঘটেনি, কিন্তু ওই যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কারণ তার অপরাধপ্রবণতা বা অপরাধের প্রতি ঝোঁক রয়েছে, সুযোগ পেলেই সে অপরাধে জড়াবে।
ছদ্মবেশে অভিযানে এসেছেন, তাই নাম ও পদবি প্রকাশ করেননি ওই ডিবি কর্মকর্তা। তবে তিনি পরিদর্শক পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি এ সময় যাদের আটক করে কাউন্সেলিং করছিলেন যেন মাদকে না জড়ায়—একপর্যায়ে ঢাকার ডিবি পুলিশের এই স্টিং অপারেশনের জন্য সাজানো মাদক স্পটের নারীদের কাছে মাফ চেয়ে তাদের মুক্তি দেওয়া হচ্ছিল।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিভিন্ন বেঞ্চিতেও ছদ্মবেশে মাদক বিক্রেতা সেজে ওই রাতে অবস্থান নিয়েছিল ডিবি পুলিশের সদস্যরা। যে মাদক কিনতে চেষ্টা করছিলেন, তাকেই কাউন্সেলিংয়ের আওতায় পড়তে হয়েছে। কেউ নিজের স্ত্রীর কাছে মোবাইলফোনে মাফ চেয়ে ছাড়া পেয়েছেন, কেউ একটা হালকা চাপড়, কেউ নিচু স্বরের গালি শুনেই মাথা নিচু করে ফিরছিলেন ডিবির স্টিং অপারেশন থেকে ছাড়া পেয়ে।
অন্যদিকে, গত আড়াই মাস নজরদারি করে দেখা গেছে—মাদকসেবীদের ধরপাকড়ের তুলনায় মাদক বিক্রেতাদের সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ছাড়া করার পদ্ধতি বেশি ফলপ্রসূ হয়েছে। তবে সপ্তাহে অন্তত ৪ দিন উদ্যানে বাধাহীন মাদক বিক্রি হতে দেখা গেছে। সেবনকারীর সংখ্যা আগের তুলনায় কমেছে। আর বিক্রেতাদের বাড়াবাড়িও অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আছে এখন।
ভিওডি বাংলা/আরকেএইচ/এমএস







