বোনের বদলে কারাবাস, ছবির অমিলে ‘আয়নাবাজি’ ফাঁস

নাম বা চেহারার মিল থাকায় একজনের পরিবর্তে আরেকজনের কারাগারে যাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। অতীতে এমন অনেক ‘আয়নাবাজি’র ঘটনা ঘটেছে। কিছু প্রকাশ্যে এসেছে, কিছু রয়ে গেছে আড়ালে। তবে এবার সামনে এসেছে বড় বোনকে বাঁচাতে গিয়ে ছোট বোনের কারাবরণের ঘটনা।
প্রতারণার মামলায় আসামি বড় বোনের বদলে আত্মসমর্পণ করেন ছোট বোন। জামিন না পাওয়ায় তাকে যেতে হয় কারাগারে। কয়েকদিন সবকিছু ঠিক ছিল। কিন্তু আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো নারীর মুখের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও পাসপোর্টের ছবির মিল না থাকায় ফাঁস হয়ে যায় পুরো ‘প্রক্সি’ কৌশল।
গত রোববার (১৭ মে) মামলার তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওই তরুণীকে তিনদিনের রিমান্ডে পাঠান ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কামাল উদ্দীন। একইসঙ্গে তদন্ত কর্মকর্তাকে এ ঘটনা তদন্তের নির্দেশও দিয়েছেন তিনি।
এর আগে, মঙ্গলবার বড় বোনের পক্ষে ছোট বোনের আত্মসমর্পণের ঘটনা ঘটে। আর বৃহস্পতিবার আসামির রিমান্ড শুনানিকালে বাদীপক্ষ দাবি করে কাঠগড়ায় উপস্থিত নারী আসল আসামি নন। এদিকে, বিষয়টি প্রকাশ্যে আসায় নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে এ মামলা থেকে সরে দাঁড়ানোর আবেদন করেছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী।
যেভাবে ধরা পড়ে ‘প্রক্সি’ আত্মসমর্পণ
আদালত সূত্রে জানা যায়, গত ১২ মে প্রতারণার মামলায় আত্মসমর্পণ করেন দুই নারী। এদের একজন নিজেকে শারমিন আক্তার একা পরিচয় দিয়ে জামিন আবেদন করেন। আদালত তাদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠান।
এরপর ১৪ মে শারমিনের রিমান্ড শুনানির জন্য আদালতে হাজির করা হলে বাদীপক্ষের আইনজীবীদের সন্দেহ হয়। তাদের দাবি ছিল, কাঠগড়ায় দাঁড়ানো নারী প্রকৃত আসামি নন। পরে বিচারক ওই নারীকে মুখ দেখাতে বলেন। তখন আদালতে থাকা জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের ছবির সঙ্গে তার চেহারার স্পষ্ট অমিল দেখা যায়। এ পর্যায়ে আদালত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে তদন্ত কর্মকর্তাকে আসামির প্রকৃত পরিচয় যাচাইয়ের নির্দেশ দেন।
রিমান্ড শুনানিতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পূর্ব থানার এসআই মাহবুবুল আলম আদালতে বলেন, প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করতে ওই নারীর জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, শিক্ষাগত সনদ ও আঙ্গুলের ছাপ সংগ্রহ প্রয়োজন। এজন্য তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার।
অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী আলমগীর হোসেন আদালতে বলেন, কাঠগড়ায় থাকা তরুণী শারমিন আক্তার একা নন, তার নাম ভাবনা। তিনি মামলার আসামি নন। বড় বোনের হয়ে ‘প্রক্সি’ আত্মসমর্পণ করেছেন মাত্র। বিষয়টি স্বীকার করা হয়েছে বলেও আদালতকে জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, যেহেতু তরুণী ভুল স্বীকার করেছেন, তাই তাকে অব্যাহতি দেয়া উচিত।
তবে বাদীপক্ষের আইনজীবী রকিবুল ইসলাম ও কাইয়ুম হোসেন নয়ন বলেন, পুরো প্রতারণা চক্রের সঙ্গে ওই নারীর সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। তাই তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ জরুরি। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আদালত তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
২০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
মামলাটি ঘিরে রয়েছে আরও বিস্ময়কর অভিযোগ। ব্যবসায়ী আজিজুল আলম উত্তরা পূর্ব-থানায় দায়ের করা মামলায় অভিযোগ করেন, ‘প্রাচীন পিলার’ ব্যবসার প্রলোভন দেখিয়ে একটি চক্র তার কাছ থেকে প্রায় ২০ কোটি ৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। একইসঙ্গে ভয়ভীতি দেখিয়ে উত্তরখান এলাকায় তার ২৭ দশমিক ১৫ কাঠা জমিও লিখে নেওয়া হয়।
মামলায় শারমিন আক্তার একাসহ ২৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৫ জানুয়ারি মনির নামে এক বন্ধুর মাধ্যমে মিজান নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় হয় বাদীর। পরে মাজহারুল ইসলাম সোহেল ফকির, নাজমুল হাসান ও কামাল নামে কয়েকজন তার অফিসে গিয়ে দাবি করেন, বিদেশে প্রাচীন পিলার বিক্রি করে বিপুল অর্থ আনা হবে এবং সেই লাভের বড় অংশ তিনি পাবেন।
বাদীর ভাষ্য অনুযায়ী, ধর্মীয় আবহ, ‘সুন্নতি লেবাস’ ও কথাবার্তার মাধ্যমে তারা তার আস্থা অর্জন করেন। এরপর ধীরে ধীরে তাকে বিভিন্ন ‘কুফরি-কালাম’, ‘শয়তানের নিঃশ্বাস’ ও অলৌকিক শক্তির ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণে নেয়া হয়।
‘জ্বিনের মা’ ও ‘জ্বিনের বাদশা’র ভয়
মামলার এজাহারে আরও অভিযোগ করা হয়, বিভিন্ন সময় তাকে খাবার ও মিষ্টির সঙ্গে কিছু খাওয়ানো হতো। এরপর তার স্বাভাবিক চিন্তাশক্তি নষ্ট হয়ে যেত এবং তিনি অভিযুক্তদের কথামতো চলতেন। একপর্যায়ে ‘জ্বিনের মা’ পরিচয়ে এক নারী বিভিন্ন নম্বর থেকে ফোন করে যোগাযোগ করতেন। পরে ‘জ্বিনের বাদশা’ পরিচয়ে রাসেল নামে একজন ফোন করে পাঁচ কোটি টাকা দাবি করেন। টাকা না দিলে বড় ধরনের ক্ষতির হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন বাদী। বাদীর দাবি, ২০২৫ সালের ১৫ মে পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে প্রতারণার মাধ্যমে তার কাছ থেকে ২০ কোটি টাকার বেশি অর্থ নেয়া হয়েছে।
ভিওডি বাংলা/এফএ







