মার্কিন নাগরিকত্ব ছাড়ছেন হাজারো মানুষ

বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশে বসবাস করা মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে চলেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সংখ্যা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন প্রবাসী সংগঠন ও গবেষণা সংস্থা জানিয়েছে। অর্থনৈতিক জটিলতা, করনীতি, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের দ্বন্দ্ব-সব মিলিয়ে অনেকে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ছেড়ে অন্য দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করছেন।
উদাহরণ হিসেবে এরিন ক্লাট (৩৪)-এর গল্পটি উল্লেখযোগ্য। প্রায় এক দশক আগে তিনি ওয়ার্কিং হলিডে ভিসায় নিউজিল্যান্ডে যান। শুরুতে এটি ছিল স্বল্পমেয়াদি অভিজ্ঞতা নেওয়ার পরিকল্পনা। তবে ধীরে ধীরে দেশটি তার জীবন ও পেশাগত স্থায়ী ঠিকানায় পরিণত হয়।
উইসকনসিনে ডেইরি ফার্মিংয়ের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নিউজিল্যান্ডে একই ধরনের চাকরি পান তিনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাজের ভিসা থেকে স্থায়ী বসবাস এবং পরবর্তীতে নাগরিকত্বও অর্জন করেন। ২০২৫ সালের মে মাসে নিউজিল্যান্ডের নাগরিকত্ব পাওয়ার পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন।
ক্লাট জানান, তিনি কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি গভীর জাতীয়তাবোধ অনুভব করেননি। পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনের সময়কার রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং প্রবাসীদের ওপর বাড়তি করের চাপ তাকে এ সিদ্ধান্তে প্রভাবিত করেছে। প্রায় ২ হাজার ৩৫০ ডলার ফি দিয়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন।
প্রবাসী আমেরিকানদের নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো বলছে, ২০২৫ সালে প্রায় ৪ হাজার ৮৮৯ জন মার্কিন নাগরিক আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন, যা সাম্প্রতিক কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। কারণ নতুন করে অনেকেই নাগরিকত্ব ত্যাগের জন্য আবেদন করছেন। ইউরোপ, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে বসবাসরত মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বর্তমানে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রবাসী সহায়তা সংস্থা প্রায় ৪০ হাজারেরও বেশি মার্কিন নাগরিককে নাগরিকত্ব সংক্রান্ত পরামর্শ দিচ্ছে বলে জানা গেছে।
নাগরিকত্ব ত্যাগের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্যাক্স নীতি, বিশেষ করে ফরেন অ্যাকাউন্ট ট্যাক্স কমপ্লায়েন্স অ্যাক্ট (FATCA)।
এই আইন অনুযায়ী, একজন মার্কিন নাগরিক পৃথিবীর যেকোনো দেশে থাকলেও তাকে যুক্তরাষ্ট্রে আয়কর দিতে হয়। বিশ্বের খুব অল্প কয়েকটি দেশেই এমন ব্যবস্থা রয়েছে।
এই নিয়ম অনেক প্রবাসীর জন্য জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে। বিশেষ করে যারা “অ্যাক্সিডেন্টাল আমেরিকান” হিসেবে পরিচিত, তারা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন। এরা সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়ার কারণে বা অভিভাবকের সূত্রে নাগরিকত্ব পেয়েছেন, কিন্তু বাস্তবে কখনো সেখানে বসবাস করেননি।
প্যারিসভিত্তিক অ্যাসোসিয়েশন অব অ্যাক্সিডেন্টাল আমেরিকান্সের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ইউরোপেই এমন প্রায় তিন লাখ মানুষ আছেন। FATCA আইনের কারণে অনেক বিদেশি ব্যাংক মার্কিন নাগরিকদের অ্যাকাউন্ট খুলতে অনীহা দেখায়, যা তাদের দৈনন্দিন আর্থিক জীবনকে কঠিন করে তোলে।
বিদেশে বসবাসকারী মার্কিন নাগরিকদের অনেকেই অভিযোগ করেন, তারা ব্যাংকিং সেবা পেতে সমস্যায় পড়েন। অনেক ব্যাংক ঝুঁকির কারণে তাদের অ্যাকাউন্ট খুলতে চায় না বা সীমিত সেবা দেয়।
এর ফলে বেতন গ্রহণ, সঞ্চয় রাখা বা পেনশন ব্যবস্থাপনার মতো মৌলিক আর্থিক কাজও জটিল হয়ে পড়ে। এই বাস্তবতা অনেককে নাগরিকত্ব ছাড়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
অর্থনৈতিক কারণ ছাড়াও অনেকের মধ্যে কাজ করছে পরিচয়ের সংকট। ইউরোপে বসবাসরত অনেক প্রবাসী মনে করেন, দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকলেও তারা কোথাও পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য নন।
ইতালিতে বসবাসরত ক্যারোলাইন চিরিচেল্লার মতো অনেকে মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রে গেলে তারা “ইতালিয়ান” আর ইউরোপে গেলে “আমেরিকান”-এই দ্বৈত পরিচয়ের চাপ থেকে মুক্তি পেতে নাগরিকত্ব ত্যাগই একমাত্র উপায়।
তিনি জানান, তিনি এখন পুরোপুরি ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিকত্ব গ্রহণের প্রক্রিয়ায় আছেন এবং ভবিষ্যতে আর যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক থাকতে চান না।
তবে আইনজীবীরা সতর্ক করছেন, নাগরিকত্ব ত্যাগ একটি দীর্ঘমেয়াদি ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। নিউইয়র্কভিত্তিক অভিবাসন আইন বিশেষজ্ঞ ব্র্যাড বার্নস্টাইনের মতে, অনেকেই আবেগ বা সাময়িক অসুবিধার কারণে এই সিদ্ধান্ত নেন, যা পরে অনুশোচনার কারণ হতে পারে।
নাগরিকত্ব ত্যাগের পর ব্যক্তি সম্পূর্ণভাবে বিদেশি নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের জন্য ভিসা বাধ্যতামূলক হয়ে যায়, যা সবসময় সহজে পাওয়া যায় না।
সূত্র: সিএনএন
ভিওডি বাংলা/জা







