আর্জেন্টিনার ফুটবল নিয়ে বাংলাদেশে এত উন্মাদনা কেন!

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেছেন আর্জেন্টিনার প্রাণভোমরা লিওনেল মেসি সেই মুহূর্তেই হাজারো সমর্থকের কণ্ঠে তখনও ধ্বনিত হচ্ছে, ‘আর্জেন্টিনা! আর্জেন্টিনা! মেসি! মেসি!’ চারদিকে বেজে চলেছে ভুভুজেলা। পুরো এলাকা যেন আকাশি-সাদা রঙের সমুদ্রে পরিণত হয়েছে। বিশাল পর্দায় খেলা দেখা তরুণরা আর্জেন্টিনার পতাকা গায়ে জড়িয়ে একে অপরের কাঁধে উঠে নাচছেন, গাইছেন, আর শেষ বাঁশির অনেক পর পর্যন্ত উদযাপন চালিয়ে যাচ্ছেন।
এমন দৃশ্য দেখে মনে হতে পারে এটি বুয়েনস আয়ারসের কোনো রাস্তা। কিন্তু বাস্তবে এটি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। আর্জেন্টিনার রাজধানী থেকে প্রায় ১৭ হাজার কিলোমিটার দূরে।
বাংলাদেশ কখনোই ফিফা বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। তবু প্রতি চার বছর পরপর আর্জেন্টিনা মাঠে নামলেই দেশের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা উৎসবে মেতে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও আবাসিক এলাকায় বসে বড় পর্দা, অ্যাপার্টমেন্টগুলোতে সারারাত ধরে খেলা দেখার আয়োজন হয়, আর রাস্তাঘাট ভরে যায় আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা রঙে।
ম্যারাডোনার হাত ধরেই শুরু
আর্জেন্টিনার প্রতি ভালোবাসার শুরু অবশ্য মেসিকে দিয়ে নয়। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনার শিরোপা জয়ের সময়ই দলটির প্রেমে পড়েন অসংখ্য সমর্থক। এরপর আর্জেন্টিনাকে আরও ৩৬ বছর অপেক্ষা করতে হয় বিশ্বকাপ জয়ের জন্য। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে মেসির নেতৃত্বে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে।
১৯৮৬-ই ছিল মোড় ঘোরানোর বছর
বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার ও কোচ শফিকুল ইসলাম মানিক বলেন, সবকিছুর শুরু ১৯৮৬ সালে। ফকল্যান্ড যুদ্ধের পর ইংল্যান্ডকে হারানো এবং এরপর ম্যারাডোনার বিশ্বকাপ জয়। এই দুটি ঘটনা সব বদলে দেয়। ম্যারাডোনার অসাধারণ ব্যক্তিগত নৈপুণ্য দেখে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরা ধীরে ধীরে আর্জেন্টিনার সমর্থক হয়ে ওঠেন।
তার মতে, ব্রাজিলের সমর্থক তখনও প্রচুর ছিল। কারণ তাদের একাধিক বিশ্বকাপ এবং কিংবদন্তি ফুটবলার ছিল। কিন্তু আর্জেন্টিনা হয়ে ওঠে ব্রাজিলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। তার আগে বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ ব্রাজিলকে সমর্থন করত। ১৯৮৬ সালের পর আর্জেন্টিনাও শক্তিশালী সমর্থকগোষ্ঠী তৈরি করতে শুরু করে। ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনার হার এবং ম্যারাডোনার কান্না বাংলাদেশের মানুষের আবেগকে আরও গভীরভাবে ছুঁয়ে যায় বলে মনে করেন তিনি।
ম্যারাডোনা যখন ট্রফি জিততে পারলেন না এবং ফাইনালের পর কেঁদেছিলেন, তখন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষও আবেগাপ্লুত হয়েছিল। এরপর থেকেই আর্জেন্টিনার সমর্থন স্থায়ী রূপ পায়। এ কারণেই জার্মানি বা ইতালির মতো দলগুলো বাংলাদেশে তেমন জনপ্রিয়তা পায়নি। কারণ ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা মানুষের আবেগের জায়গাটা আগেই দখল করে ফেলেছিল।
ফুটবল থেকে কূটনীতি
বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার প্রতি ভালোবাসা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলেছে। বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত মার্সেলো কার্লোস সেসা ঢাকার বিভিন্ন পাবলিক স্ক্রিনিংয়ে সমর্থকদের সঙ্গে বসে খেলা দেখেন এবং আর্জেন্টিনার জয় উদযাপন করেন। ২০২২ সালের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা-উন্মাদনা বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিলে ২০২৩ সালে বুয়েনস আয়ারস সরকার ঢাকায় ৪৫ বছর পর আবার দূতাবাস চালু করে। ১৯৭৮ সালে সামরিক সরকারের সময় বাজেট সংকোচনের কারণে দূতাবাসটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। যদিও দূতাবাস পুনরায় চালুর পেছনে বাণিজ্য ও কূটনৈতিক স্বার্থও ছিল, দুই দেশের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে ফুটবল দুই দেশের জনগণের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

নতুন প্রজন্মের নায়ক মেসি
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে ম্যারাডোনার চেয়ে মেসির আকর্ষণ অনেক বেশি। আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচের কয়েক ঘণ্টা আগে ঢাকায় সমর্থকদের ‘ওয়েলকাম র্যালি’তে অংশ নেয় লাখো তরুণ সমর্থক। চারপাশে তখন ঢাক বাজচ্ছে, বিশাল আর্জেন্টিনার পতাকা উড়ছে এবং বৃষ্টিভেজা রাস্তায় গান গাইতে গাইতে এগিয়ে যাচ্ছে সবাই।
রাত ৪টার ম্যাচ, তবু ঘুম নেই
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্রে হওয়ায় বাংলাদেশের সময় অনুযায়ী অনেক ম্যাচই গভীর রাতে হচ্ছে। গ্রুপ পর্বে শীর্ষস্থান অর্জনের পর আর্জেন্টিনা শেষ ৩২-এর ম্যাচে কেপ ভার্দের মুখোমুখি হবে, যা বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টায় শুরু হবে। কিন্তু এতে সমর্থকদের উৎসাহ কমেনি। সমর্থকদের মতে, তাদের অ্যালার্মের দরকার হয় না। আর্জেন্টিনা খেললে নিজে থেকেই ঘুম থেকে উঠে যান।
আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল বিভাজন
ক্রীড়া সাংবাদিক ও ভাষ্যকার শাহানুর রাব্বানী মনে করেন, বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের জনপ্রিয়তার মূল কারণ এই দুই দলের কিংবদন্তি ফুটবলাররা। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে দক্ষিণ আমেরিকার এই দুটি দলই ধারাবাহিকভাবে সাফল্য পেয়েছে। আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল বহুবার বিশ্বকাপ জিতেছে। ম্যারাডোনা থেকে রোনালদো, রিভালদো, আর এখন মেসি ও নেইমার- সব সময়ই এমন তারকা ছিল, যারা মানুষকে এই দলগুলোর দিকে আকৃষ্ট করেছে। তার ভাষায়, বাংলাদেশের মানুষ নায়ককে ভালোবাসে। এটি দলীয় খেলা হলেও তারা একজন নায়ক খুঁজে নিতে পছন্দ করে।
একই পরিবারে দুই শিবির
বাংলাদেশে অনেক পরিবারেই ফুটবল সমর্থন নিয়ে বিভক্তি রয়েছে। ছোট ভাই ব্রাজিলের সমর্থক। কিন্তু আর্জেন্টিনার র্যালিতে এসেছেন বড় ভাইয়ের জোরাজুরিতে। আবার বাবা আর্জেন্টিনার সমর্থক, আর মা ব্রাজিলের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে বড় পর্দায় মেসির হ্যাটট্রিক উদযাপনের সময়ও সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা চোখে পড়ে। আর্জেন্টিনার জার্সির ভিড়ে এক ব্রাজিল সমর্থক কিশোরকে বন্ধুরা মজা করে বলছিল, ‘সে তো বলেছিল ম্যাচ ড্র হবে!’ কেউ কেউ আবার নিজেদের পোষা প্রাণীকে আর্জেন্টিনার জার্সি পরিয়েছেন, নামও রেখেছেন মেসি।
বাংলাদেশ কি কখনো বিশ্বকাপে খেলবে?
সাংবাদিক শাহানুর রাব্বানী বলেন, বাংলাদেশের মানুষ ফুটবলকে এত ভালোবাসলেও সেই আবেগ কেন দেশের ফুটবলে সাফল্যে রূপ নেয়নি? বর্তমানে ফিফা পুরুষ র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮১তম। মানুষের এই উচ্ছ্বাস দেখে আমার খুব ভালো লাগে। কিন্তু একই সঙ্গে কষ্টও হয়। এত আবেগ থাকার পরও আমাদের ফুটবল এবং সামগ্রিক ক্রীড়া কাক্সিক্ষত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি।
তার মতে, সমস্যার মূল কারণ অবকাঠামো ও পরিকল্পনার অভাব। পর্যাপ্ত মাঠ, প্রশিক্ষণকেন্দ্র কিংবা একাডেমি নেই। তরুণদের খেলোয়াড় হওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট পথও নেই। মানুষের আগ্রহ আছে, খেলতে চায়, কিন্তু কীভাবে এগোবে তা অনেকেই জানে না।
সাবেক কোচ শফিকুল ইসলাম মানিকও একই মত প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এক সময় আমাদের ভালো খেলোয়াড় ছিল। কিন্তু পরবর্তী প্রজন্ম গড়ে তোলার জন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা হয়নি। তরুণরা কালই বাংলাদেশকে বিশ্বকাপে দেখতে চায় না। তারা শুধু একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ এবং ফুটবলকে সঠিক পথে এগিয়ে যেতে দেখতে চায়।
ভিওডি বাংলা/এফএ








মন্তব্য