আলোচনায় বড় বাধা হরমুজের নিয়ন্ত্রণ

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি এখন বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনা সামনে রেখে এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক তৎপরতার পর সৃষ্ট উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় বসার প্রস্তুতি নিলেও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইস্যু এখন সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ—প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস—এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। অথচ গত কয়েক মাসে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে জ্বালানি পরিবহন প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে, বর্তমানে যে অল্পসংখ্যক জাহাজ চলাচল করছে, তার বেশিরভাগই ইরানের।
পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, প্রণালিটির ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে ইরান কৌশলগত অবস্থান নিয়েছে। সংঘাত শুরুর পর থেকেই তারা কার্যত এই জলপথে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামে। তেলের মূল্য বৃদ্ধি ও সরবরাহ অনিশ্চয়তা বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে ইরান এই প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর স্থায়ী টোল বা মাশুল আরোপ করতে পারে। তবে এমন উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্র সম্মত হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যে এককভাবে ইরানের প্রভাব বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
সংঘাত শুরুর আগে প্রতিদিন যেখানে শতাধিক জাহাজ এই প্রণালি অতিক্রম করত, বর্তমানে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে হাতে গোনা কয়েকটিতে।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল মার্কেট ইন্টেলিজেন্স-এর তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার থেকে রোববার পর্যন্ত মাত্র ৩৬টি জাহাজ এই পথ ব্যবহার করেছে।
অন্যদিকে শিপিং বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলার জানিয়েছে, গত ১৩ এপ্রিল মার্কিন অবরোধের পর থেকে অন্তত ২৭টি ইরানি জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করেছে। বিপরীতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সমসংখ্যক জাহাজকে বিকল্প পথ ব্যবহার করতে বাধ্য করেছে।
পণ্য ও কাঁচামাল বাজার বিশ্লেষণকারী সংস্থা সিআরইউ গ্রুপ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, অন্তত মে মাসের শেষ পর্যন্ত এই অচলাবস্থা অব্যাহত থাকতে পারে। এতে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা ও উচ্চমূল্য বজায় থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌযান চলাচল পুনরুদ্ধারে দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতির জন্য গুরুতর হতে পারে। জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
এই সংকটের মানবিক দিকটিও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাজার হাজার নাবিক বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ এই জলসীমায় আটকা পড়েছেন, যা সম্ভাব্য মানবিক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সৃষ্ট এই টানাপোড়েন শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাই নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারের জন্যও বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এখন দৃষ্টি আসন্ন আলোচনার দিকে—যেখানে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণই হতে পারে সমাধান কিংবা আরও বড় সংকটের সূচনা।
ভিওডি বাংলা/আরকেএইচ/এসআর







