সুন্দরবনে বাঘের অস্তিত্ব হুমকির মুখে!

বাংলাদেশের বিশাল ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে বাঘ এতটাই আতঙ্কের নাম যে, বনজীবীরা আত্মরক্ষার জন্য অলৌকিক শক্তির কাছে প্রার্থনা করেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন সময় এসেছে বাঘগুলোকেই মানুষের হাত থেকে রক্ষা করার।
বাসস্থান ধ্বংস, চোরাশিকার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সুন্দরবনে বাঘের অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে। এ সংকট নিয়ে প্রথম দিকে যারা সরব হয়েছিলেন, তাদেরই একজন আবদুল গণি গাজী। ৪৫ বছর বয়সী এই ব্যক্তি স্থানীয়ভাবে ‘গণি টাইগার’ নামে পরিচিত। বনের প্রান্তঘেঁষা মানুষের সঙ্গে বাঘের সহাবস্থান নিশ্চিত করতেই তিনি জীবন উৎসর্গ করেছেন।
ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও এই মানবাধিকার কর্মী দাবি করেন, এ পর্যন্ত তিনি বন্দুক বা ফাঁদ থেকে ৩৬টি বেঙ্গল টাইগার এবং বাঘের মুখ থেকে ১০৬ জন স্থানীয় বাসিন্দাকে রক্ষা করেছেন। কখনো তিনি ক্রুদ্ধ গ্রামাসীবাসীকে বাঘ নিধন থেকে থামিয়েছেন, আবার কখনও বাঘের আক্রমণে নিহত মানুষের ছিন্নভিন্ন দেহ উদ্ধার করে ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন।
গণি গাজী বলেন, ‘সুন্দরবন এবং এর ওপর নির্ভরশীল হাজার হাজার মানুষকে বাঁচাতে হলে আমাদের বেঙ্গল টাইগারকে টিকিয়ে রাখতে হবে’।
বাংলাদেশ ও ভারতজুড়ে বিস্তৃত ইউনেস্কো স্বীকৃত এ বিশ্ব ঐতিহ্যের আয়তন প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার। বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য রক্ষায় বাঘের ভূমিকা অপরিসীম। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ বলেন, ‘সুন্দরবনে একটি বাঘ মারা গেলে পুরো বাস্তুসংস্থানে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়’।
বনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংস্কৃতিতে বাঘের প্রভাব গভীর। লোকবিশ্বাসে বনবিবি বা দক্ষিণ রায়ের মতো শক্তির আরাধনা করা হয় বনের বিপদ থেকে বাঁচতে। ৬৩ বছর বয়সী গ্রামবাসী আশুতোষ মন্ডল বলেন, ‘বনবিবির নাম জপলে তিনি আমাদের বাঘ, সাপ আর কুমির থেকে রক্ষা করবেন’।
২০১০ সালে বাংলাদেশ বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যা তখন ৪১৪টি বলে ধারণা করা হতো। কিন্তু ২০১৫ সালে ক্যামেরা ট্র্যাপ পদ্ধতির মাধ্যমে দেখা যায় বাঘের সংখ্যা মাত্র ১০৬টি। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে ১১৪ এবং ২০২৪ সালে ১২৫টি বাঘ গণনা করা হয়। অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে মাত্র দুটি করে বাঘ বাড়ছে। এ ধীরগতি বাংলাদেশের সংরক্ষণ প্রচেষ্টার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
বন বিভাগের প্রধান বন সংরক্ষক আমির হোসাইন চৌধুরী জানান, আবাসস্থল হারানোই এখন মূল চ্যালেঞ্জ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং শক্তিশালী ঝড়ের কারণে মাটিতে লবণাক্ততা বাড়ছে, যা কৃষি জমি নষ্ট করছে।
ফলে মানুষ কাজের খোঁজে বাঘের এলাকায় প্রবেশ করছে। তিনি আরও জানান, জোয়ারের সময় বাঘ ও অন্য প্রাণীদের আশ্রয়ের জন্য বনে মাটির কেল্লা তৈরি করা হয়েছে।
বন ও বন্যপ্রাণী পাচার বিশেষজ্ঞ নাসির উদ্দিন জানান, জেল-জরিমানার ভয় উপেক্ষা করেও চোরাশিকারীরা বাঘ হত্যা করছে। বাঘের চামড়া, দাঁত ও হাড় ভারত, মিয়ানমার, চীনসহ ইউরোপের দেশগুলোতেও পাচার হচ্ছে।
এছাড়া বাঘের প্রধান খাদ্য হরিণ শিকারও বড় উদ্বেগের কারণ। ২০১৩ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিবছর প্রায় ১১ হাজার হরিণ অবৈধভাবে শিকার করা হয়। খাদ্যের অভাবে বাঘ লোকালয়ে চলে আসে, যা মানুষ ও বাঘের মধ্যে দ্বন্দ্ব বাড়িয়ে দেয়।
এত চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সংস্থা ‘প্যানথেরা’র বিশেষজ্ঞ অভিষেক হরিহর আশার আলো দেখছেন। তিনি বলেন, সত্তর দশক থেকে শুরু হওয়া সংরক্ষণ প্রচেষ্টার ফলে বাঘের সংখ্যা একেবারে বিলুপ্ত হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে এ প্রজাতির টিকে থাকার সম্ভাবনা জাগিয়ে রেখেছে।
ভিওডি বাংলা/এসআর







