পশু পরিবহন: কোরবানির হাটে কঠোর নজরদারি চান বাকৃবি গবেষকরা

প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধ, মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা এবং দায়িত্বশীল প্রতিপালনের মাধ্যমে প্রাণিকল্যাণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রাণিকল্যাণ আইন ২০১৯ প্রণয়ন করে সরকার। তবে পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশে কোরবানির পশু পরিবহনে আবারও প্রকাশ্যে আসছে চরম অব্যবস্থাপনা ও নিষ্ঠুরতার চিত্র।
প্রাণিকল্যাণ আইন ২০১৯ কার্যকর থাকলেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় ট্রাক, পিকআপ ও নৌকায় গাদাগাদি করে পশু পরিবহন, পা বেঁধে উল্টো করে শোয়ানো, চলন্ত অবস্থায় মারধর কিংবা জবাইয়ের আগে অমানবিক আচরণের মতো ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।
আইনের যথাযথ প্রয়োগ, মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারির অভাব এবং প্রাণিকল্যাণ আইন বাস্তবায়ন নিয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদালয়ের (বাকৃবি) ফিজিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ও প্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ আলম মিয়া। তিনি বলেন, প্রাণী মানবসভ্যতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও কৃষিকাজ, পরিবহন, খাদ্য উৎপাদন এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহারের সময় বহু ক্ষেত্রে তাদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করা হয়, যা নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য। ব্রিটিশ আমলের দ্য ক্রুয়েলটি টু অ্যানিমেলস অ্যাক্ট ১৯২০ বাতিল করে প্রাণীদের প্রতি সদয় আচরণ, নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধ এবং দায়িত্বশীল প্রতিপালন নিশ্চিত করতে প্রাণিকল্যাণ আইন ২০১৯ প্রণয়ন করা হলেও মাঠপর্যায়ে এর বাস্তবায়ন এখনো দুর্বল।
অধ্যাপক আলম মিয়া বলেন, আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী প্রাণী পরিবহনের সময় পর্যাপ্ত খাদ্য ও পানি সরবরাহ করতে হবে। অভুক্ত বা তৃষ্ণার্ত প্রাণী পরিবহন করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। একই সঙ্গে পশুবাহী যানবাহনে পর্যাপ্ত আলো ও বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা থাকতে হবে, কারণ বদ্ধ ও অন্ধকার পরিবেশে দীর্ঘক্ষণ প্রাণী আটকে রাখা নিষিদ্ধ। যানবাহনে পশুর স্বাভাবিক দাঁড়ানো, বসা ও নড়াচড়ার সুযোগ থাকতে হবে, এবং অতিরিক্ত পশু ঠেসে বোঝাই করাও আইনের লঙ্ঘন। পরিবহনকালে মারধর, লাথি মারা বা অন্য কোনো শারীরিক নিপীড়ন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অসুস্থ বা গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত প্রাণীকে চিকিৎসা ছাড়া পরিবহন করা যাবে না। দীর্ঘপথে পরিবহনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিরতিতে বিশ্রাম, খাবার ও পানি দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ঈদুল আজহার সময় এসব বিধিনিষেধ বারবার লঙ্ঘিত হতে দেখা যায়। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে লাখ লাখ পশু রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় ও জেলা শহরের হাটে আনা হয়। এ সময় ট্রাকে পা বেঁধে পশু উপুড় করে রাখা, গলায় আঘাত করে শান্ত করার চেষ্টা কিংবা ধারণক্ষমতার বেশি পশু বোঝাইয়ের মতো নিষ্ঠুরতা প্রায় নিয়মিত চিত্রে পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোরবানির পশু পরিবহন ও জবাইয়ের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন এবং ইসলামী শরীয়াহ—দুই দিকই যথাযথভাবে মানা জরুরি।
কোরবানির ক্ষেত্রেও আইন ও ধর্মীয় নির্দেশনা মানবিক আচরণের ওপর গুরুত্ব দেয়। জবাইয়ের আগে অত্যন্ত ধারালো ছুরি ব্যবহার, এক প্রাণীর সামনে অন্য প্রাণী জবাই না করা, পশুকে আঘাত না করে আস্তে মাটিতে শোয়ানো এবং জবাইয়ের আগে পানি পান করানো উচিত। জবাইয়ের সময় মাথায় আঘাত করা, চোখে মরিচের গুঁড়া দেওয়া বা অন্য কোনো উপায়ে কষ্ট দিয়ে শান্ত করার চেষ্টা নিষিদ্ধ। জবাইয়ের পর পশুর শরীর থেকে সম্পূর্ণ প্রাণ বায়ু নির্গত হওয়ার আগে চামড়া ছাড়ানো বা অন্য কোনো অঙ্গচ্ছেদ করাও অনুচিত ও দণ্ডনীয়। একই সঙ্গে কোরবানির স্থান পরিষ্কার রাখা এবং বর্জ্য সঠিকভাবে অপসারণ করাও জরুরি। যত্রতত্র বা প্রকাশ্য রাস্তায় জবাই করলে পরিবেশ দূষণ ও যানজটের ঝুঁকি বাড়ে, তাই নির্ধারিত জোনে কোরবানি দেওয়া বাঞ্ছনীয়।
বাকৃবির এ গবেষক বলেন, আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; মানুষের আচরণ বদলানো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মসজিদের খুতবার মাধ্যমে ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে দেশব্যাপী মসজিদে বিশেষ খুতবা চালু করে কোরবানির সঠিক ও মানবিক পদ্ধতি প্রচারের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
তরুণদের সম্পৃক্ত করতে ইনফোগ্রাফিক, শর্ট ভিডিও, স্কুল-কলেজে রচনা ও বিতর্ক প্রতিযোগিতা, হাট-বাজারে লিফলেট, পোস্টার ও বিলবোর্ড ব্যবহারের পরামর্শও দেন অধ্যাপক আলম মিয়া। আইন কার্যকরে মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়ানোর ওপরও তিনি জোর দেন।
ঈদুল আজহার মৌসুমে স্থানীয় প্রশাসন ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সমন্বয়ে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে নিয়মিত হাট ও জবাইয়ের স্থান পরিদর্শনের কথা বলেন তিনি। এই টাস্কফোর্সে ভেটেরিনারি সার্জন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও জনপ্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবও দেন তিনি। তাঁর মতে, মাঠপর্যায়ে কার্যকর মোবাইল ভেটেরিনারি টিম নজরদারির একটি শক্তিশালী ভিত্তি হতে পারে। অতিরিক্ত চাপ বা নির্মমতার বিরুদ্ধে অনস্পট মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে কঠোর জরিমানা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করলে তা অপরাধ দমনে কার্যকর হবে।
পশুব্যবসায়ী, খামারি, পরিবহনকারী ও কসাইদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণও অপরিহার্য বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। পশু পরিবহন, নিরাপদ লোডিং-আনলোডিং, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, দ্রুত ও যন্ত্রণামুক্ত জবাই, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ধর্মীয় অনুশাসনের ব্যবহারিক দিক নিয়ে প্রশিক্ষণ দিলে অজ্ঞতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে হওয়া নির্যাতন অনেকটাই কমবে। কসাইদের আধুনিক ও স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে জবাইয়ের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে, যাতে অদক্ষতার কারণে পশু অকারণে কষ্ট না পায়।
এছাড়া সিটি কর্পোরেশন ও স্থানীয় সরকার পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট কোরবানি জোন, পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ এবং বর্জ্য অপসারণের ব্যবস্থা থাকলে কোরবানির সময় নগর ও গ্রামীণ পরিবেশ অনেক বেশি শৃঙ্খলিত রাখা সম্ভব হবে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রাণিকল্যাণ সংস্থাগুলোকেও রোগ নিয়ন্ত্রণ, পথপ্রাণী ব্যবস্থাপনা, উদ্ধার ও পুনর্বাসন এবং জেলা পর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে।
অধ্যাপক আলম মিয়া আরও বলেন, প্রাণিকল্যাণ আইন ২০১৯ দেশের প্রাণী সুরক্ষায় একটি যুগান্তকারী মাইলফলক। ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি প্রাণীর প্রতি সদয় আচরণ করা একজন সত্যিকারের মুমিনের বৈশিষ্ট্য। একইভাবে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্মেও অহিংসা ও সৃষ্টির প্রতি মমত্বের শিক্ষা রয়েছে। তাঁর মতে, ধর্মীয় মূল্যবোধ, প্রশাসনিক তদারকি ও জনসচেতনতা একসঙ্গে কাজ করলে কোরবানির সময় প্রাণীর প্রতি মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে এবং বাংলাদেশ প্রাণিকল্যাণে একটি আদর্শ মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।
ভিওডি বাংলা/আরাফাত হোসাইন/এফএ







