কোরালিয়ায় চিরনিদ্রায় শায়িত প্রবীণ রাজনীতিক তোফায়েল আহমেদ

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক, মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত নেতা এবং প্রবীণ রাজনীতিক তোফায়েল আহমেদকে তাঁর জন্মভূমি ভোলায় চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (২ জুন) বিকেল সোয়া ৪টার দিকে ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। সেখানে তাঁর বাবা-মা এবং স্ত্রীর কবরের পাশেই সমাহিত করা হয় এ বর্ষীয়ান রাজনীতিককে।
এর আগে দুপুর আড়াইটায় ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী, প্রশাসনের কর্মকর্তা, মুক্তিযোদ্ধা, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং হাজারো সাধারণ মানুষ অংশ নেন। শেষ বিদায়ে পুরো এলাকায় এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তোফায়েল আহমেদ। তাঁর পিতা মৌলভী আজহার আলী ছিলেন একজন ব্যবসায়ী এবং মা ফাতেমা খানম গৃহিণী।
পারিবারিক জীবনে ১৯৬৪ সালে তিনি আনোয়ারা বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের এক কন্যাসন্তান রয়েছে। শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি পারিবারিক দায়িত্বও তিনি সমানভাবে পালন করেন বলে ঘনিষ্ঠরা জানান।

শিক্ষা ও ছাত্ররাজনীতিতে উত্থান
তোফায়েল আহমেদ ১৯৬০ সালে ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ থেকে ১৯৬২ সালে আইএসসি এবং ১৯৬৪ সালে বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকা বিজ্ঞানে এমএসসি সম্পন্ন করেন।
ছাত্রজীবনেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হন। ব্রজমোহন কলেজ ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক এবং অশ্বিনী কুমার হলের সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ইকবাল হল (বর্তমান শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তিনি সহসভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।
৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের নায়ক
১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ডাকসুর ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তোফায়েল আহমেদ ছাত্ররাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর নেতৃত্বে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনকে একত্র করে গড়ে ওঠে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে তিনি ছিলেন অন্যতম প্রধান সংগঠক। ৬ দফা আন্দোলনকে ১১ দফা কর্মসূচিতে রূপান্তরের মাধ্যমে আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত ও তীব্র করে তোলেন তিনি।
আন্দোলনের সময় দীর্ঘদিন কারাবন্দি থাকা শেখ মুজিবুর রহমানসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সব রাজবন্দির মুক্তির দাবিতে দেশজুড়ে যে গণআন্দোলন গড়ে ওঠে, তাতে তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্ব ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানসহ সব রাজনৈতিক বন্দির মুক্তির পর পরদিন ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঐতিহাসিক জনসমাবেশে শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন তিনি-যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা।
মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনৈতিক ভূমিকা
১৯৭০ সালের নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি মুজিব বাহিনীর অন্যতম আঞ্চলিক অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বরিশাল, পটুয়াখালী, খুলনা, ফরিদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া ও পাবনা অঞ্চলের সমন্বয়ে গঠিত পশ্চিমাঞ্চলের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধের সংগঠন, সমন্বয় এবং জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে রাজনৈতিক সচিব হিসেবে নিয়োগ দেন।
সংসদীয় ও মন্ত্রীত্ব জীবন
স্বাধীন বাংলাদেশে তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ধারাবাহিকভাবে বিস্তৃত হয়। ১৯৭৩ সালে তিনি ভোলা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রপতির বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একই বছর ১৫ আগস্টের পর তিনি গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘ সময় কারাবন্দি থাকেন।
পরবর্তীতে ১৯৮৬, ১৯৯১ এবং ১৯৯৬ সালে পরপর তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর তিনি শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
২০০৮ সালে আবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ২০১৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি মোট ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে ৯টিতে বিজয়ী হয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
রাজনৈতিক জীবনের শেষ অধ্যায়
২০২১ সালের পর শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাঁর সক্রিয় রাজনৈতিক কার্যক্রম কিছুটা সীমিত হয়ে পড়ে। তবে ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনে তিনি আবারও নির্বাচিত হন, যদিও স্বাস্থ্যগত কারণে তাঁর অংশগ্রহণ ছিল সীমিত।
রাজনৈতিক মহলে তাঁকে একজন অভিজ্ঞ সংগঠক, দক্ষ বক্তা এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ভিওডি বাংলা/জা







