জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী দেশ ভালো নেই: জামায়াত আমির

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, দেশের মানুষের যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা ছিল, বাস্তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। তার ভাষায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে “দেশ ভালো অবস্থায় নেই”।
মঙ্গলবার (২ জুন) দুপুরে সিলেট সদর উপজেলার সোনাতলা গ্রামে ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যার শিকার শিশু ফাহিমার পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব মন্তব্য করেন।
ফাহিমার পরিবারের সঙ্গে দেখা করার সময় গভীর আবেগ প্রকাশ করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, একটি শিশু, যাকে তিনি “ফুলের মতো নিষ্পাপ” হিসেবে উল্লেখ করেন, তাকে নির্মমভাবে জীবন থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ ধরনের ঘটনায় সমাজে চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তার মতে, শুধু একটি ঘটনা নয়, বরং একের পর এক এমন ঘটনা সমাজের নৈতিক অবক্ষয়কে স্পষ্ট করে তুলছে। তিনি বলেন, শিশু ও নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় আরও কঠোরতা প্রয়োজন।
ফাহিমা হত্যা মামলার বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বিচার দীর্ঘসূত্রতায় পড়লে ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। তাই তিনি দাবি করেন, এ ধরনের মামলায় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে রায় প্রদান করা উচিত।
তিনি আরও বলেন, বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার জন্য ১৫ দিনের মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে হবে-এমন একটি অবস্থান তিনি তুলে ধরেন।
জামায়াত আমির মন্তব্য করেন, সমাজে অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থান নেওয়া জরুরি। তার মতে, যারা শিশু ও নারীর ওপর সহিংসতা চালায় তাদের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে অপরাধ প্রবণতা আরও বাড়বে।
তিনি বলেন, এ ধরনের অপরাধ শুধু ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, বরং পুরো সমাজের বিবেকের ওপর আঘাত। এজন্য অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দেওয়া জরুরি।
ডা. শফিকুর রহমান দাবি করেন, ফাহিমা হত্যার মতো ঘটনার পরও যদি যথাযথ তদন্ত ও চার্জশিট দাখিল বিলম্বিত হয়, তাহলে জনমনে উদ্বেগ বাড়ে। তিনি বলেন, ২৮ দিন পার হলেও অগ্রগতি না থাকায় প্রশ্ন উঠছে বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে।
তিনি স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, দায়িত্ব পালনে কোনো ব্যর্থতা থাকলে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বে থাকা উচিত নয়।
দেশের শাসনব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়েও মন্তব্য করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের আরও বিনয়ী হওয়া প্রয়োজন। তার মতে, সরকার জনগণের “পাহারাদার”, মালিক নয়।
তিনি দাবি করেন, কখনও কখনও ক্ষমতাসীনদের আচরণে মনে হয় তারা জনগণের চেয়ে নিজেদের ক্ষমতাকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন-যা গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী।
তিনি আরও বলেন, বিচার ও আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর প্রধান দায়িত্ব, যা যথাযথভাবে পালন না হলে জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ফাহিমা হত্যার ঘটনায় অভিযুক্তদের বিষয়ে তিনি বলেন, ঘটনাটি একক ব্যক্তির মাধ্যমে সংঘটিত হয়নি বলে তাদের ধারণা। তিনি দাবি করেন, এর সঙ্গে পারিবারিক ও অন্যান্য পক্ষের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে, যা তদন্তে খতিয়ে দেখা উচিত। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তিনি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধানের ওপর জোর দেন।
শিশু ফাহিমার পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, দলীয়ভাবে তারা পরিবারটির পাশে থাকবে। তিনি আইনি সহায়তা ও মানবিক সহায়তার আশ্বাস দেন।
এছাড়া তিনি স্থানীয় মানুষদেরও পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান, যাতে তারা মানসিক ও সামাজিকভাবে ভেঙে না পড়েন।
সাক্ষাৎ শেষে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, এমন ঘটনার সামনে দাঁড়িয়ে কারও জন্যই স্বাভাবিক থাকা কঠিন। তিনি বলেন, ভুক্তভোগী পরিবারের কষ্ট অনুভব করা ছাড়া উপায় নেই।
তার ভাষায়, “ফাহিমার মতো শিশুদের হারানোর বেদনা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।”
দেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি নিয়ে তিনি সমালোচনা করেন।
তার মতে, এক মাসের ব্যবধানে একাধিক দফায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। পরিবহন খরচ বাড়ার কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়বে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, এমন সিদ্ধান্তের ফলে ধনী-গরিব সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এটি জনজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি বাজারে পড়ে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, পরিবহন ব্যয় বাড়লে খাদ্য ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়, যা নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য বড় চাপ তৈরি করে।
তিনি এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জনস্বার্থ বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো জনগণের নিরাপত্তা ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা। অপরাধ দমন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং জনজীবনের চাপ কমানো সরকারের মৌলিক দায়িত্ব।
ভিওডি বাংলা/জা







