তোফায়েল আহমেদের ক্ষোভে যেভাবে বন্ধ হয়েছিল ৪ ক্যাডেট কলেজ

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে রাজনীতি চালু করতে ব্যর্থ হয়ে দেশের সবগুলো ক্যাডেট কলেজ বন্ধ করিয়েছিলেন সদ্য প্রয়াত প্রবীন রাজনীতিবিদ আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ। রাজনীতিকে আপাদমস্তক ধারণ করে গোটা মানুষটি এমন এক রাজনীতিক যন্ত্র হয়ে পড়েছিলেন যে- কলেজগুলোর কাঠামোগত রূপও বদলে দিয়েছিলেন তিনি। ভেবেছিলেন, রাজনীতিই একমাত্র মুক্তির মন্ত্র। যদিও সেই রাজনীতিই তাকে শেষ বেলায় অবহেলিত কোনঠাসা করে রেখেছিল নিজ দলেও, সেই রাজনীতিই বিঘ্ন সৃষ্টি করল তার শেষ বিদায়েও।
সে সময় দেশে মোট ৪টি ক্যাডেট কলেজ ছিল। তোফায়েল আহমেদের ব্যাক্তিগত ক্ষোভে এসব কলেজ বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে একটি স্মৃতিচারণ লেখায়। বলা হয়, ১৯৭২ সালের শেষদিকে তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদের ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ সফর এবং সেখানে ছাত্রলীগের কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধের জেরে ক্যাডেট কলেজগুলো বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ক্যাডেট কলেজ ব্লগে প্রকাশিত ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের ১৩তম ব্যাচের সাবেক ক্যাডেট মিনু খাদেমের স্মৃতিচারণামূলক এক লেখা থেকে জানা যায়, তোফায়েল আহমেদ ক্যাডেট কলেজে ছাত্রলীগের কমিটি গঠনের উদ্দেশ্যে একটি সভার আয়োজন করেন। তবে ক্যাডেটরা কলেজে ছাত্ররাজনীতি প্রবেশের বিরোধিতা করে সভাটি বর্জন করেন। এতে তিনি ক্ষুব্ধ হন বলে ওই লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এর কিছুদিন পর সরকারিভাবে তৎকালীন সময়ে ফৌজদারহাট, ঝিনাইদহ, মির্জাপুর ও রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ বন্ধ করে সেগুলোকে সরকারি আবাসিক কলেজে রূপান্তরের ঘোষণা দেওয়া হয়। এমনকি ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের নাম পরিবর্তন করে ‘ফৌজদারহাট সরকারি আবাসিক কলেজ’ উল্লেখ করে সাইনবোর্ডও টানানো হয়েছিল বলে ওই স্মৃতিচারণায় উল্লেখ রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের শিক্ষার্থীরা ‘কিপ ক্যাডেট কলেজেস ক্যাম্পেইন’ শুরু করেন। আন্দোলনের অংশ হিসেবে কয়েকজন সিনিয়র ক্যাডেট ঢাকায় এসে সাবেক ক্যাডেট ও সামরিক কর্মকর্তা কর্নেল চৌধুরী এম. মহসিনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তার পরামর্শে তারা তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার জিয়াউর রহমানের (শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান) সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, যিনি সে সময় ক্যাডেট কলেজ গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান।
মিনু খাদেমের বর্ণনা অনুযায়ী, জিয়াউর রহমান বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে তৎকালীন নৌপরিবহনমন্ত্রী জেনারেল এম এ জি ওসমানীর সঙ্গে আলোচনা করেন এবং আন্দোলনকারী ক্যাডেটদের সঙ্গে তার সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেন। পরদিন জেনারেল ওসমানীর মিন্টু রোডের বাসভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ক্যাডেট কলেজগুলোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। পুরো বিষয়টি জানার পর ওসমানী ক্যাডেট কলেজ রক্ষার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেন। সরাসরি শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এমনকি তিনি ‘ক্যাডেট কলেজ থাকলে আমিও থাকব, না থাকলে পদত্যাগ করব’ এমন অবস্থানও ব্যক্ত করেছিলেন বলে লেখায় উল্লেখ রয়েছে।
পরবর্তীতে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর ওসমানী আন্দোলনকারী ক্যাডেটদের জানান যে, ক্যাডেট কলেজ বন্ধের সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পূর্বের কাঠামোতেই বহাল থাকবে।
বর্তমানে বাংলাদেশে ছেলে ও মেয়েদের মিলিয়ে মোট ১২টি ক্যাডেট কলেজ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সে সময়ের আন্দোলন সফল না হলে দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ এই শিক্ষা ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা হয়তো রক্ষা পেত না।
ভিওডি বাংলা/সম্রাট/আরআর/এমএস







