হরিপুর উন্নয়নে ইউএনওকে ২৭ দফা স্মারকলিপি ‘অক্সিজেনে’র

সীমান্তবর্তী ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলাকে একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, পরিবেশবান্ধব ও পরিকল্পিত জনপদ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে উপজেলা প্রশাসনের কাছে ২৭ দফা উন্নয়ন প্রস্তাব উত্থাপন করেছে সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘অক্সিজেন’।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) সংগঠনের সভাপতি মো. মোজাহেদুল ইসলাম ইমনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)-এর কার্যালয়ে গিয়ে স্মারকলিপিটি জমা দেয়। এতে উপজেলার দীর্ঘদিনের বিভিন্ন সমস্যা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, জনসেবার ঘাটতি এবং সম্ভাবনাময় খাতগুলোর উন্নয়নের বিষয়ে বিস্তারিত সুপারিশ তুলে ধরা হয়।
সংগঠনের নেতারা জানান, স্থানীয় জনগণের মতামত, বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে অর্জিত অভিজ্ঞতা এবং এলাকার বাস্তব চাহিদা বিবেচনায় প্রস্তাবনাগুলো প্রস্তুত করা হয়েছে। নতুন উপজেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে এসব বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে হরিপুরের উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
স্মারকলিপিতে স্বাস্থ্যখাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট দূর করা এবং চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়নের দাবি জানানো হয়েছে।
পাশাপাশি কৃষি, ভূমি, স্বাস্থ্য, পরিবহন ও আইনগত সেবাসহ বিভিন্ন সরকারি সেবাকে প্রযুক্তিনির্ভর করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি দপ্তরগুলোতে হয়রানি ও ঘুষমুক্ত সেবা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
উপজেলার সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নকে অপরিহার্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। স্মারকলিপিতে উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, সেতু ও কালভার্ট সংস্কারের পাশাপাশি নতুন অবকাঠামো নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
বিশেষ করে হরিপুর কারবালা মাঠ থেকে বটতলী হাটপুকুর পর্যন্ত চার লেনের সড়ক নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া প্রধান সড়কগুলোর সম্প্রসারণ, যাত্রী ছাউনির উন্নয়ন, টেকসই ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ এবং আধুনিক বাস টার্মিনাল স্থাপনের দাবি জানানো হয়।
হরিপুরের পর্যটন খাতকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছে সংগঠনটি। নাগর নদীর ভিউ পয়েন্ট এলাকাকে ইকোপার্ক ও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে ঐতিহাসিক হরিপুর রাজবাড়ীর সংরক্ষণ, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যভিত্তিক একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হয়েছে। যাদুরাণী হাটকে পর্যটকবান্ধব ও নান্দনিক স্থানে পরিণত করার সুপারিশও রয়েছে স্মারকলিপিতে।
সংগঠনটির মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় অর্থনীতি চাঙ্গা হওয়ার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
শিক্ষার মানোন্নয়নকে টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে উপজেলার স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসাগুলোতে গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এছাড়া সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের জন্য একটি আধুনিক মুক্তমঞ্চ নির্মাণের দাবি তোলা হয়। মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস ও সংস্কৃতিভিত্তিক একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও স্মারকলিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিষয়টি স্মারকলিপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও খাস জমিতে ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ, বন বিভাগের কার্যক্রম আরও সক্রিয় করা এবং ঔষধি গাছের চাষে উৎসাহ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া অতিথি পাখির জন্য অভয়াশ্রম গড়ে তোলা, খাল পুনঃখনন, জলাধার পুনরুদ্ধার এবং পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
কালীগঞ্জ-হরিপুর উপজেলা পরিষদ সড়কের ব্রিজসংলগ্ন জলাধার পুনঃখনন ও সৌন্দর্যবর্ধনের মাধ্যমে এলাকাটিকে বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাবও রয়েছে।
স্থানীয় অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করতে হরিপুরে একটি স্থলবন্দর প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হয়েছে। সংগঠনটির মতে, সীমান্তবর্তী এই উপজেলায় স্থলবন্দর চালু হলে বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এছাড়া উদ্যোক্তা, ব্যাংকার, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সমন্বয়ে কর্মশালার আয়োজনের মাধ্যমে শিল্প ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের পরিবেশ তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে।
তরুণ প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে ক্রীড়ার গুরুত্ব তুলে ধরে নতুন ক্রিকেট মাঠ নির্মাণের দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি আধুনিক জিমনেসিয়াম ও সুইমিংপুল স্থাপনের প্রস্তাবও স্মারকলিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
শিশুদের জন্য উপজেলা প্রশাসনের শিশু পার্ক আধুনিকায়ন, সবুজায়ন এবং খেলাধুলার পরিবেশ উন্নয়নের সুপারিশ করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
এছাড়া দরিদ্র ও অসহায় জনগোষ্ঠীকে শ্রেণিভিত্তিক তালিকাভুক্ত করে সরকারি সহায়তা কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পরিচালনার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রস্তাবিত উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে উপজেলার দীর্ঘদিনের নানা সমস্যা সমাধান হবে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন ও পরিবেশ খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতেও এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
অক্সিজেনের সভাপতি মো. মোজাহেদুল ইসলাম ইমন বলেন, “হরিপুরের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ও বাস্তব প্রয়োজনকে সামনে রেখেই আমরা এই স্মারকলিপি প্রস্তুত করেছি। আমাদের লক্ষ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি আধুনিক, পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও বাসযোগ্য উপজেলা গড়ে তোলা। প্রশাসনের আন্তরিক সহযোগিতায় প্রস্তাবগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।”
ভিওডি বাংলা/জহরুল ইসলাম (জীবন)/জা







