এক বিলিয়ন ব্যারেল তেল উধাও, জ্বালানিতে নতুন উদ্বেগ

প্রায় চার মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে স্বাভাবিকভাবে তেল সরবরাহ বন্ধ ছিল। এর ফলে বিশ্ববাজার থেকে হারিয়ে গেছে ১১৫ কোটি ব্যারেলেরও বেশি তেল।
যুদ্ধ ও আঞ্চলিক অস্থিরতার কারণে সৃষ্ট এই ঘাটতি এখন বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে এমন এক অবস্থায় নিয়ে গেছে, যাকে বিশ্লেষকরা বলছেন "বিপজ্জনক মোড়"।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী আবারও খুলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এটি কি খুব দেরিতে হলো?
কেন গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী?
বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের একটি বড় অংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবহন করা হয়। পারস্য উপসাগরকে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করা এই সংকীর্ণ জলপথ দীর্ঘদিন ধরেই বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
যুদ্ধ চলাকালে এই পথ কার্যত অচল হয়ে পড়লে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
জ্বালানি বিশ্লেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লেপারের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতের সময় বিশ্ববাজারে মোট ১.১৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেলের সরবরাহ হারিয়ে গেছে।
মজুত তেলের ভাণ্ডার কতটা চাপে?
বিশ্বের কৌশলগত তেল মজুত বর্তমানে কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার কৌশলগত রিজার্ভ ১৯৯০ সালের পর সবচেয়ে নিচে নেমে এসেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জরুরি তেল মজুত ৪৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সরকারি মজুত নয়, বাণিজ্যিক গুদামগুলোর অবস্থাও উদ্বেগজনক।
যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা অঙ্গরাজ্যের কুশিং তেল সংরক্ষণ কেন্দ্র, যেটিকে অনেক সময় মার্কিন তেলবাজারের "হার্টবিট" বলা হয়, ইতোমধ্যে অপারেশনাল স্ট্রেস লেভেলে পৌঁছেছে।
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, পরিস্থিতি অনেকটা কফির পাত্রের একেবারে তলানিতে পৌঁছে যাওয়ার মতো-যেখানে অবশিষ্ট অংশ ব্যবহার করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
তাহলে দাম কমছে কেন?
সাধারণত সরবরাহ সংকট দেখা দিলে তেলের দাম বাড়ার কথা। কিন্তু সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
যুদ্ধ চলাকালে প্রতি ব্যারেল ১২৬ ডলারের ওপরে উঠে যাওয়া দাম বর্তমানে ৮০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে।
বাজারের অনেক বিনিয়োগকারী বিশ্বাস করছেন, হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু হওয়ায় শিগগিরই বিপুল পরিমাণ তেল আবার বাজারে ফিরবে। ফলে তারা ভবিষ্যতের সরবরাহ বৃদ্ধির প্রত্যাশায় দাম কমাচ্ছেন।
তবে সবাই এই আশাবাদের সঙ্গে একমত নন।
সামনে কি আবার দাম বাড়তে পারে?
বিশ্লেষকদের একটি অংশ বলছেন, প্রণালী খুলে গেলেও বাস্তবে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হতে অনেক সময় লাগবে।
প্রথমে সমুদ্রপথ নিরাপদ করতে হবে, তারপর খালি ট্যাংকারগুলোকে আবার ওই অঞ্চলে ফিরতে হবে। তেলক্ষেত্রগুলোতে উৎপাদন শুরু করে সেই তেল গন্তব্যে পৌঁছাতে আরও কয়েক সপ্তাহ বা মাস লেগে যেতে পারে।
আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ হেলিমা ক্রফটের ভাষায়, বাজার বাস্তব পরিস্থিতির চেয়ে অনেক এগিয়ে গিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে।
তার মতে, অনেকে ধরে নিচ্ছেন সংকট শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু সরবরাহ স্বাভাবিক করতে এখনো বড় ধরনের লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
উদ্বেগ কতটা বাস্তব?
অন্যদিকে কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও আতঙ্কিত হওয়ার মতো নয়।
তাদের যুক্তি, যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্ববাজারে তেলের অতিরিক্ত সরবরাহ ছিল। সেই অতিরিক্ত মজুতের বড় অংশ শেষ হয়ে গেলেও পুরোপুরি নিঃশেষ হয়নি।
উদাহরণ হিসেবে বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেল ও পেট্রোলের মজুত কমেছে ঠিকই, তবে তা এখনও দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় খুব বেশি নিচে নামেনি।
এরপর কী?
বিশ্ববাজারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার গতি কি মজুত ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই চাহিদা পূরণ করতে পারবে?
যদি তা না হয়, তাহলে বর্তমান মূল্যপতন সাময়িক হতে পারে এবং আগামী মাসগুলোতে তেলের দাম আবারও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো সম্ভব হলে বাজারে নতুন সরবরাহ ফিরে আসবে এবং মূল্যচাপ কমে যেতে পারে।
ফলে হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু হওয়া স্বস্তির খবর হলেও, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
ভিওডি বাংলা/জা







