সুন্দরবনে জিম্মি ১৩ মৌয়াল, ৮২ হাজার টাকা মুক্তিপণে ছাড়া পেলেন

খুলনার কয়রা উপজেলা থেকে মধু সংগ্রহে সুন্দরবনে যাওয়া ১৩ জন মৌয়াল দুই দিন ধরে বনদস্যুদের হাতে জিম্মি থাকার পর মুক্তি পেয়েছেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ‘দুলাভাই বাহিনী’ নামে পরিচিত দস্যুরা তাঁদের মারধর, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং নৌকার সব মালামাল লুট করে নেয়। পরে ৮২ হাজার টাকা মুক্তিপণ আদায়ের পর তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
শনিবার সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরেন ওই মৌয়ালরা। পরে রোববার (১০ মে) দুপুরে কয়রা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন তারা।
মুক্তি পাওয়া মৌয়ালরা হলেন কাটাখালী গ্রামের হারুন গাজী ও আবদুল গফুর গাজী, বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের শহিদুল ইসলাম, পরিমল চন্দ্র সরকার, চরণ সরকার, মালেক গাজী, আফতাব আলী, খোকন মণ্ডল, মহানন্দ মণ্ডল, কালাম গাজী, পিরআলী গাজী, খোদাবক্স গাজী ও হান্নান গাজী।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, গত বৃহস্পতিবার বন বিভাগের বানিয়াখালী ফরেস্ট স্টেশন থেকে পাস-পারমিট নিয়ে তারা সুন্দরবনের উদ্দেশে রওনা দেন। সন্ধ্যার দিকে শিবসা নদী অতিক্রম করে কুমড়োকাঠি খাল এলাকায় পৌঁছালে অস্ত্রধারী দস্যুরা তাদের দুটি নৌকা ঘিরে ফেলে এবং পরে জোরপূর্বক জঙ্গলের ভেতরে নিয়ে যায়।
মৌয়াল হারুন অর রশীদ বলেন, জঙ্গলের ভেতর থেকে অস্ত্র তাক করে নৌকা থামানো হয়। পরে দস্যুরা নিজেদের ‘দুলাভাই বাহিনী’ পরিচয় দিয়ে প্রথমে নৌকার সব টাকাপয়সা নিয়ে নেয় এবং পরে দেড় লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। তিনি বলেন, দস্যুরা তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে বিকাশের মাধ্যমে টাকা পাঠাতে বাধ্য করে। দস্যুরা চলে যাওয়ার সময় তাদের দলের একটি ভিজিটিং কার্ড দিয়েছে। সেখানে থাকা ফোন নম্বরে ভবিষ্যতে সুন্দরবনে ঢোকার আগে যোগাযোগ করতে বলেছে।
মৌয়াল খোকন মণ্ডল বলেন, ‘আমাদের দুটি নৌকার মৌয়ালদের জিম্মি করার পর রাত প্রায় ৯টার দিকে ডাকাতদের একজন এসে বলল, “প্রত্যেক নৌকা থেকে একজন করে গার্জিয়ান আমাদের ট্রলারে আসো। দুলাভাই ডাকছে।” তখন আমাদের নৌকা থেকে আমি গেলাম। যাকে সবাই “দুলাভাই” বলে ডাকছিল, সেই ডাকাত বলল, “দেড় লাখ টাকা দিতে হবে। টাকা না দিলে কাউকে ছাড়া হবে না”।’
তিনি আরও বলেন, ‘পরে সবাই মিলে মোট ৮২ হাজার টাকা দিয়ে মুক্তি পাই। তবে শুধু মুক্তিপণের টাকা না, আমাদের কাছে যা কিছু ছিল, সব নিয়ে গেছে। প্রত্যেকের পকেটে থাকা খুচরা টাকা পর্যন্ত তল্লাশি করে নিয়ে নিয়েছে। শেষ পর্যন্ত তারা আমাদের কাপড় খুলে তল্লাশি করেছে। শরীরের ভেতরে কোথাও টাকা লুকানো আছে কি না, তা দেখার জন্য সবাইকে কাপড় ছেড়ে দাঁড় করিয়েছে। কাউকে ছাড় দেয়নি। আমি বয়স্ক মানুষ, আমাকেও রেহাই দেয়নি।’
ভুক্তভোগীরা জানান, মুক্তি পাওয়ার পর বাড়ির পথে ফেরার সময় তারা আরেক দস্যুদল ‘জাহাঙ্গীর বাহিনী’র মুখোমুখি হন। মৌয়াল গফুর গাজী বলেন, ‘জাহাঙ্গীর বাহিনীর লোকজনের কাছে আমরা বলি, দুলাভাই বাহিনী দুই দিন ধরে আমাদের আটক করে রেখেছিল। আমাদের কাছ থেকে সব টাকাপয়সা ও মালামাল নিয়ে গেছে। একটু আগেই ছেড়ে দিয়েছে।’
গফুর গাজী আরও বলেন, ‘দস্যু জাহাঙ্গীর তখন জানতে চায়, দুলাভাই বাহিনী কোন খালে আছে। আমরা বলি, কুমড়োকাঠি খালে। এরপর তারা আর আমাদের দিকে খেয়াল করেনি। জাহাঙ্গীর বাহিনীর সদস্যরা দ্রুতগতিতে ট্রলার চালিয়ে কুমড়োকাঠি খালের দিকে চলে যায় দুলাভাই বাহিনীকে ধরতে। পরে দুই বাহিনীর মধ্যে মুখোমুখি কোনো ঘটনা ঘটেছিল কি না, তা আমরা আর জানি না। আমরা তখন দ্রুত নৌকা বেয়ে বানিয়াখালী ফরেস্ট স্টেশনের দিকে চলে আসি।’
ভুক্তভোগী মৌয়ালদের দাবি, জলদস্যু দুলাভাই বাহিনীর সদস্যরা জানিয়েছে যে কয়রার আমাদী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. হাসানের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ রয়েছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে হাসান বলেন, ‘সুন্দরবনের দুলাভাই বাহিনীর সদস্য আফজালের শ্বশুরবাড়ি আমাদের গ্রামে। তাঁর শ্বশুরের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে আমার ব্যক্তিগত বিরোধ চলছে। সেই শত্রুতার জের ধরেই আমাকে এ ঘটনায় ফাঁসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। আসলে অতীতে দস্যু আফজাল ও তার শ্বশুর একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিল। তারা মনে করে, ওই ঘটনায় আমার হাত ছিল। সেই ক্ষোভ থেকেই আমার বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালায় তারা।’
কয়রা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহ আলম বলেন, রোববার দুপুরে মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে আসা মৌয়ালরা থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তবে ঘটনাস্থল খুলনার দাকোপ থানার আওতাধীন এলাকায় পড়লেও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
ভিওডি বাংলা/এমএস







